ঢাকার ইতিহাস, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক লালকুঠি নতুন রূপে ফিরতে যাচ্ছে। প্রায় তিন বছরের সংস্কার শেষে ১৫২ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটির কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা লাল ইটের দৃষ্টিনন্দন ভবনটি দীর্ঘদিন অবহেলা ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। সংস্কারের মাধ্যমে এখন ভবনটির ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলী পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের জন্যও এটি আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও লালকুঠি সংস্কার প্রকল্পের পরিচালক রাজীব খাদেম জানান, ২০২৩ সালে সংস্কার কাজ শুরু হয়। বর্তমানে মূল সংস্কার শেষ হয়েছে। এখন ভবনের পুরোনো সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে কিছু সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে।

তিনি বলেন, একসময় পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ভবনটি পরে গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। সেখানে ব্রিটিশ আমলের কিছু আসবাবপত্র ও দুর্লভ বই অবহেলায় পড়ে ছিল। পরে ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

রাজীব খাদেম জানান, সংস্কারের সময় ভবনের মূল কাঠামো ও ঐতিহ্য রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কাজে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। দেয়ালে ফাঙ্গাস প্রতিরোধে বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় দেড়শ থেকে ২০০ বছর আগের আদলে ভবনটির রূপ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, লালকুঠির সঙ্গে থাকা জনসন হলে সংরক্ষিত ব্রিটিশ আমলের দুর্লভ বইগুলো নিয়ে আবারও পাঠাগার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ভবনটির ইতিহাস দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরতে তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড স্থাপনের কাজও চলছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের লালকুঠি ঘাটের বিপরীতে ফরাশগঞ্জ ও শ্যামবাজার সংযোগস্থলে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক এই ভবন। সংস্কারের পর ভবনের লালচে ইটের নকশা ও নান্দনিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভবনের সামনে নির্মিত কৃত্রিম ফোয়ারা দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ যোগ করেছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. নাছির আহমাদ জানান, ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক ১৮৭৪ সালে ঢাকা সফর করলে তাঁর স্মরণে ভবনটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৮৮০ সালের ২৫ মে ভবনটির উদ্বোধন করা হয়। তৎকালীন ঢাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এর নাম দেন ‘নর্থব্রুক হল’।

তিনি বলেন, সে সময় এখানে বিভিন্ন সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হতো। পরে ১৮৮২ সালে ভবনটির একটি অংশ পাঠাগারে রূপান্তর করা হয় এবং ‘জনসন হল’ নামে ক্লাবঘর সংযুক্ত করা হয়।

ড. নাছির আহমাদ জানান, অল্পসংখ্যক বই নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও কয়েক বছরের মধ্যে পাঠাগারের বইয়ের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ১৮৮৭ সালে ইংল্যান্ড থেকে এ পাঠাগারের জন্য বিশেষভাবে বই আনা হয়েছিল।

ঐতিহাসিক এই ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির স্মৃতিও। ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি এখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তবে পাকিস্তান আমলে নর্থব্রুক হল ধীরে ধীরে তার ঐতিহ্য হারাতে শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাঠাগারের অধিকাংশ বই নষ্ট হয়ে যায়।

সংস্কারের পর নতুন রূপে সাজানো লালকুঠি এখন দর্শনার্থীদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। রামপুরা থেকে ঘুরতে আসা জান্নাতুল আদনিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখে তিনি বন্ধুদের নিয়ে এখানে এসেছেন। বাস্তবে জায়গাটি ছবির চেয়েও সুন্দর মনে হয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসান সজিব বলেন, ভবনের প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে আকর্ষণীয়। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো ও ছবি তোলার জন্য এটি দারুণ একটি জায়গা। তবে ভবনের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ চালু হলে দর্শনার্থীদের আগ্রহ আরও বাড়বে।