সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন বাইশটিলা এলাকায় প্রকৃতিকে অক্ষত রেখে গড়ে তোলা হচ্ছে ব্যতিক্রমধর্মী এক পর্যটনকেন্দ্র। বিচ্ছিন্ন একটি টিলাকে ঘিরে নির্মাণাধীন ‘দিনব্যাপী প্রাকৃতিক অবকাশ যাপন কেন্দ্র’ এখন রূপ নিচ্ছে সম্ভাবনাময় পর্যটন হাবে। টিলা না কেটেই বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সিলেটের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য।
শুক্রবার বিকেলে এলাকা পরিদর্শন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী।
জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার সিংহ ও প্রকল্পের স্থপতি রাজন দাশ প্রকল্পের নকশা ও সম্ভাব্য সম্প্রসারণ পরিকল্পনা মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। পরিদর্শন শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী পুরো এলাকাকে ভবিষ্যতে একটি ‘পর্যটন হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
টিলা কাটা নয়, টিলা রক্ষার উদ্যোগ
সিলেটে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে টিলা কাটার অভিযোগ রয়েছে। সেই বাস্তবতায় জেলা পরিষদের এই উদ্যোগকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে। ‘ন্যাচারাল পার্ক’ এলাকার একটি টিলাকে সম্পূর্ণ অক্ষত রেখেই সেখানে অবকাশযাপন কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং টিলাভিত্তিক প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণেরও একটি উদাহরণ।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নতুন উদ্যোগ
স্থানীয় ইতিহাস বলছে, সিলেটে টিলাবান্ধব স্থাপত্যের ধারণা নতুন নয়। ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত মুরারিচাঁদ কলেজ বা এমসি কলেজ ১৯২১ সালে টিলাগড় এলাকার ‘থ্যাকারে টিলা’য় স্থানান্তরিত হয়। তখন টিলা অক্ষত রেখেই নির্মাণ করা হয়েছিল কলেজের অবকাঠামো।
ঐতিহাসিক তথ্যে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলেও সিলেটের প্রশাসনিক ভবনগুলো টিলার ওপর নির্মাণ করা হতো। এমসি কলেজ ক্যাম্পাসের মূল ভবনগুলোও নির্মিত হয়েছিল টিলা সংরক্ষণের নকশা অনুসরণ করে। দীর্ঘ সময় পর আবারও সরকারি উদ্যোগে সেই ধারণার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বাইশটিলায়।
কেন বিশেষ বাইশটিলা
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন বাইশটিলা একসময় ২২টি টিলার জন্য পরিচিত ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে গেলেও নামটি রয়ে গেছে। এলাকাটির প্রাকৃতিক পরিবেশ এখনো পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
সবুজ টিলা, জলাশয়, হাওরঘেরা নিরিবিলি পরিবেশ এবং বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থান প্রকল্পটিকে বাড়তি সম্ভাবনা দিয়েছে। জেলা পরিষদের প্রায় ৫৬ একর জমির একটি অংশ বিমানবন্দরের সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে পাঁচটি টিলা ও একটি জলাশয় মিলিয়ে প্রায় ৪০ একর জায়গা নিয়ে প্রকল্প এলাকা গড়ে উঠছে।
‘নিঃসঙ্গ টিলা’কে ঘিরে পরিকল্পনা
প্রকল্পের স্থপতি রাজন দাশের ভাষায়, এলাকার একটি বিচ্ছিন্ন টিলাকে তিনি ‘নিঃসঙ্গ টিলা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সেই টিলাকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে পুরো অবকাশযাপন কেন্দ্র।
টিলার গা বেয়ে থাকবে সিঁড়ি। ওপরে থাকবে ছাউনি ও বিভিন্ন উচ্চতায় নির্মিত দোচালা-চৌচালা বসার স্থান। দর্শনার্থীরা সেখানে বসে উপভোগ করতে পারবেন চারপাশের জলাশয় ও বৃক্ষরাজির প্রাকৃতিক দৃশ্য।
প্রকল্পের প্রথম ধাপ শেষে টিলার ঢালে ঋতুভিত্তিক গাছপালা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্ষা, বসন্তসহ ছয় ঋতুর বৈচিত্র্য আলাদা করে ফুটিয়ে তোলার চিন্তাও রয়েছে নকশায়।
কী কী সুবিধা থাকছে
জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, দর্শনার্থীদের প্রথমে জলাশয়ের পাড়ে তৈরি রিসেপশন ঘাটে যেতে হবে। সেখান থেকে দেশীয় নৌকা বা স্পিডবোটে করে পৌঁছানো যাবে টিলার পাদদেশে।
প্রকল্পে থাকছে একটি কিচেন, বিশ্রামাগার, মাছ ধরার ব্যবস্থা এবং জলাশয়ের মাঝের মাটির ঢিবির সঙ্গে সংযুক্ত ঝুলন্ত সেতু। তবে এখানে রাতযাপনের সুযোগ রাখা হচ্ছে না। পুরো কেন্দ্রটি মূলত দিনব্যাপী অবকাশযাপনের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে বড় পরিকল্পনা
প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ এখনো শুরু হয়নি। তবে ভবিষ্যৎ মাস্টারপ্ল্যানে ক্যাবল কার, শিশুদের রাইড, ফুডকোর্ট, অ্যাম্পিথিয়েটার, মেলার মাঠ, রিসোর্ট, পার্কিং ও আধুনিক রেস্টরুম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে বাইশটিলা সিলেটের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।