সবুজ মাঠ, সরিষার হলুদ গালিচা, নদী-বিলের নৌভ্রমণ, চরাঞ্চলের কৃষিজীবন আর গারো পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। প্রকৃতি ও কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রার এমন সমন্বয় শেরপুরকে গড়ে তুলতে পারে দেশের অন্যতম কৃষি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে কৃষি পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে।
কৃষিপ্রধান জেলা শেরপুরে বছরের বিভিন্ন সময় জুড়ে দেখা মেলে ভিন্ন ভিন্ন ফসলের সমারোহ। ধান, সরিষা, ফলদ বাগান, সবজি ক্ষেত, মাছের খামার এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রা পর্যটকদের জন্য হতে পারে বিশেষ আকর্ষণ। বিশেষ করে শহুরে শিশু-কিশোর ও তরুণদের কাছে কৃষির বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করতে পারে এই খাত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অনেক শিশু ও তরুণ ভাত খেলেও ধান উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া কখনো কাছ থেকে দেখেনি। কৃষকের শ্রম, প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম এবং মাঠভিত্তিক জীবন সম্পর্কে তাদের বাস্তব ধারণা সীমিত। কৃষি পর্যটন সেই দূরত্ব কমাতে পারে।
ঈদ বা অন্যান্য ছুটিতে পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধব নিয়ে গ্রামে ভ্রমণের প্রবণতা বাড়ছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অঞ্চলভিত্তিক কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে পর্যটন বিকাশ করা সম্ভব। যেমন রাজশাহীর আম, দিনাজপুরের লিচু, সিলেটের চা কিংবা শেরপুরের তুলসীমালা ধানকে ঘিরে আলাদা পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করা যেতে পারে।
শেরপুরের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত বছরের বিভিন্ন মৌসুমে ভিন্ন রূপ ধারণ করে। ধান রোপণ থেকে শুরু করে সোনালি ফসল ঘরে তোলার দৃশ্য পর্যটকদের জন্য হতে পারে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা। শীতকালে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরিষা ফুলে ছেয়ে যায় মাঠ। বিশেষ করে সদর উপজেলার চরাঞ্চল এবং নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ও উরফা ইউনিয়নের সরিষা ক্ষেত দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ তৈরি করে।
নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে সরিষা ফুল ফোটার সময় পুরো এলাকা হলুদ রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। এ সময় মৌচাষিদের মধু সংগ্রহ কার্যক্রম পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ দিতে পারে। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত মধু বিক্রির ব্যবস্থাও কৃষি পর্যটনের অংশ হতে পারে।
জেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে আম, জাম, লিচু, কলা ও পেঁপের মিশ্র ফলদ বাগান। পাশাপাশি রয়েছে ঔষধি গাছের নার্সারি, বনজ উদ্ভিদের সংগ্রহ এবং অর্কিড বাগান। এসব স্থান প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
শেরপুরে এক সময় প্রায় ২০টি খাল, অর্ধশত বিল এবং সাতটি নদী ছিল। এখনো জেলার বিভিন্ন জলাশয়ে নৌভ্রমণ, মাছ ধরা, পাখি দেখা ও নৌকা বাইচের আয়োজন পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরার অভিজ্ঞতাও পর্যটকদের জন্য ব্যতিক্রমী হতে পারে।
এছাড়া কৃষিনির্ভর রাইস মিল, হিমাগার, মুড়ি ও চিড়ার মিলসহ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো পরিদর্শনের সুযোগও তৈরি করা সম্ভব। কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত পুরো চক্র দেখার সুযোগ পেলে দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চরাঞ্চলের কৃষিজীবন এবং গারো পাহাড় এলাকার মানুষের সংগ্রামী জীবনও কৃষি পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। স্থানীয়দের সঙ্গে মাঠে কাজ করা, কৃষিকাজ দেখা এবং তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানা পর্যটকদের জন্য ভিন্ন অভিজ্ঞতা এনে দিতে পারে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল-অমিন বলেন, গারো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, কৃষকদের জীবনসংগ্রাম এবং কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। কৃষকের মুখ থেকে সরাসরি ফসল উৎপাদনের গল্প শুনলেও দর্শনার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, নিরাপদ পর্যটন পরিবেশ, স্থানীয় গাইড এবং পরিকল্পিত প্রচারণা নিশ্চিত করা গেলে শেরপুরে কৃষি পর্যটন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও কৃষির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহও বৃদ্ধি পাবে।