বঙ্গোপসাগরের প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণের অনুমোদিত সময়সীমা শেষ হলো আজ শনিবার। আগামীকাল ১ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৯ মাস দ্বীপটি পর্যটকশূন্য থাকবে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে সরকার এই সময়সীমা নির্ধারণ করেছে।

গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসের জন্য সেন্ট মার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। তবে রাতযাপনের অনুমতি না থাকায় নভেম্বর মাসে কার্যত কোনো পর্যটক যাননি। মূলত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাসেই দ্বীপে পর্যটনের চাপ ছিল। এই সময়ে মোট ১ লাখ ১৭ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেছেন।
শেষ দিনে দ্বীপ ছাড়লেন হাজারো মানুষ
দ্বীপের বাসিন্দারা জানান, আজ বিকেলে ছয়টি পর্যটকবাহী জাহাজ ও কয়েকটি কাঠের ট্রলারে করে অন্তত তিন হাজার মানুষ সেন্ট মার্টিন ছেড়েছেন। তাঁদের মধ্যে পর্যটক, হোটেল–রেস্তোরাঁর কর্মচারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা রয়েছেন। বিকেল চারটার পর থেকেই দ্বীপের প্রায় সব হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়।
জাহাজে পর্যটক ছিল না
পর্যটকবাহী জাহাজমালিকদের সংগঠন ‘সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, আজ সকাল সাতটায় কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা জেটি থেকে ছয়টি জাহাজ সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করে। এসব জাহাজে কোনো পর্যটক ছিল না। বেলা একটার দিকে জাহাজগুলো দ্বীপে পৌঁছে সেখানে থাকা প্রায় ২ হাজার ৫০০ পর্যটক নিয়ে বিকেল তিনটার মধ্যে কক্সবাজারের পথে ফেরে।
এ ছাড়া প্রায় ৫০০ হোটেল ও রেস্তোরাঁকর্মী কাঠের ট্রলারে করে দ্বীপ ছেড়েছেন।
পর্যটকসংখ্যা প্রায় লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি
হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, সরকার দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটকের সীমা নির্ধারণ করেছিল। সে হিসাবে দুই মাসে ভ্রমণের সম্ভাব্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার। বাস্তবে ভ্রমণ করেছেন ১ লাখ ১৭ হাজার মানুষ, যা গত বছরের তুলনায় দেড় থেকে দুই হাজার বেশি।
৯ মাস বন্ধ থাকবে দ্বীপ
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত বছরের ২২ অক্টোবর ১২ দফা নির্দেশনাসংবলিত প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে বলা হয়, প্রতিবছর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত সেন্ট মার্টিন পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকবে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস ভ্রমণের অনুমতি থাকবে, তবে নভেম্বর মাসে রাতযাপন নিষিদ্ধ। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সীমিত আকারে রাতযাপনের সুযোগ দেওয়া হয়।
কঠোর পরিবেশগত বিধিনিষেধ
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, সেন্ট মার্টিনে রাতে আলোকসজ্জা, শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও বিক্রি নিষিদ্ধ। সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ কোনো জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না।
সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ সব ধরনের মোটরচালিত যান চলাচল নিষিদ্ধ। পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী বহন ও ব্যবহারের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
ফিরছে জীববৈচিত্র্য
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহবুব পাশা জানান, বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ায় দ্বীপের পরিবেশ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এবছর প্রতিবেশসংকটাপন্ন ছেঁড়াদিয়ায় পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় বালুচরে শামুক-ঝিনুকের বিস্তার দেখা গেছে। সৈকতে বারবিকিউ ও আলোকসজ্জা বন্ধ থাকায় নতুন গাছ ও সামুদ্রিক গুল্ম জন্মাচ্ছে।
কর্মসংস্থান সংকটের শঙ্কা
সেন্ট মার্টিন দোকান মালিক সমিতির সহসভাপতি মৌলভি নুর আহমদ বলেন, টানা দুই মাস ব্যবসা কিছুটা চাঙা ছিল। এখন দুই শতাধিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট অন্তত তিন হাজার মানুষ আগামী নয় মাস কর্মহীন থাকবেন।
নিরাপত্তা ছিল নিশ্চিত
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার অঞ্চলের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ জানান, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, জাহাজ ও কক্সবাজারের জেটি এলাকায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। এ সময়ে কোনো পর্যটক হয়রানি বা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েননি।