রাঙামাটির পাহাড়ি জনপদের পথে পথে প্রকৃতি যেন নিজেই গল্প বলে। আসামবস্তী থেকে কাপ্তাই অভিমুখী ১৮ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা বিকল্প সড়কটি এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং পর্যটকদের জন্য এক অনন্য দর্শনীয় গন্তব্য। পাহাড়, হ্রদ, সবুজ অরণ্য আর মেঘের লুকোচুরি মিলিয়ে এই পথ হয়ে উঠেছে প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বর্গভূমি।
একবার এই সড়কে পা রাখলে সহজে ফিরে যেতে মন চায় না। এক পাশে নীল কাপ্তাই হ্রদ, অন্য পাশে সবুজ পাহাড়ের সারি। প্রকৃতির এমন মেলবন্ধনে কখন যে সময় কেটে যায়, তা বোঝার উপায় থাকে না। অনেক পর্যটকের মতে, রাঙামাটি ভ্রমণ এই সড়ক না দেখলে অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
এই পথের সৌন্দর্য মনে করিয়ে দেয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চিরচেনা পঙ্ক্তি—
“গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ, আমার মন ভুলায় রে।”
১৮ কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে আছে নানান দৃশ্য ও জীবনযাত্রা। বড়াদাম এলাকায় কাপ্তাই হ্রদের বুকে নির্মিত হয়েছে বৌদ্ধধর্মীয় গুরু শ্রীমৎ সাধানানন্দ মহাস্থবীর বনভান্তের স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিমন্দির। এটি বর্তমানে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। প্রতিদিন ভক্তদের ভিড়ে মুখর থাকে এলাকা, গড়ে উঠেছে ছোট চা-স্টল ও স্থানীয় হাটবাজার। পাহাড়ি নারীদের শাকসবজি, ফলমূল আর হ্রদে মাছ ধরার দৃশ্য পথচলতি মানুষকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।
এই সড়কের বড়াদাম অংশে দাঁড়ালে এক নজরেই দেখা যায় পুরো রাঙামাটি শহর। দূর থেকে শহরটিকে মনে হয় যেন নীল জলের মাঝে ভাসমান একটি দ্বীপ। ক্লান্ত ভ্রমণ শেষে সড়কের পাশে গড়ে ওঠা ‘বার্গি লেক’, ‘বড় গাঙ’ বা ‘বেড়ান্নে রেস্টুরেন্ট’-এ বসে পাহাড়ি ও দেশীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। পাশাপাশি কাপ্তাই হ্রদে প্যাডেল বোট ও কায়াকিংয়ের ব্যবস্থাও পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ দিচ্ছে।
২০১৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের পর প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডি সড়কটি পুনর্নির্মাণ ও দুই লেনে উন্নীত করে। এতে রাঙামাটি থেকে কাপ্তাইয়ের দূরত্ব কমেছে প্রায় ২০ কিলোমিটার। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তা জোরদার ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এই আঁকাবাঁকা সড়কটি রাঙামাটির অন্যতম প্রধান পর্যটন স্পটে পরিণত হতে পারে।