ঈদের ছুটিতে অনেকেই স্বল্প খরচে কাছাকাছি কোথাও ঘুরতে যেতে চান। নদীর বিস্তৃত জলরাশি, ঐতিহাসিক স্মৃতি, পুরোনো স্থাপত্য এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্বাদ একসঙ্গে পেতে চাইলে উত্তরাঞ্চলের জেলা সিরাজগঞ্জ হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য। যমুনা তীরের এই জেলায় অল্প সময়েই ঘুরে দেখা যায় নদীপাড়, সেতু, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ। ঈদের ছুটিতে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে এক দিনের ভ্রমণেও এখানকার বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা সম্ভব।
নদীভিত্তিক জীবন, সাহিত্য ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যের সমন্বয়ে সিরাজগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই ভ্রমণপিপাসুদের কাছে পরিচিত। জেলার বেশির ভাগ দর্শনীয় স্থানে জেলা শহর থেকে সহজেই পৌঁছানো যায় এবং বেশির ভাগ জায়গায় প্রবেশমূল্যও নেই।
পুরাতন জেলখানা ঘাট ও সিরাজগঞ্জ পৌর শিশুপার্ক
পুরাতন জেলখানা ঘাট জেলা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে যমুনা নদী তীরবর্তী একটি জনপ্রিয় ঘোরার জায়গা। রিকশা বা অটোরিকশায় জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকায় এখানে পৌঁছানো যায়। প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট লাগে না।
নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখা, নদীর বাতাস উপভোগ করা এবং ছবি তোলার জন্য জায়গাটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। ঈদের সময় পরিবার ও বন্ধুদের ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি।
ঘাটের পাশেই রয়েছে সিরাজগঞ্জ পৌর শিশুপার্ক। সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই পার্ক। প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৩০ টাকা। শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইড থাকায় পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এটি ভালো একটি স্থান।
সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ হার্ডপয়েন্ট
পুরাতন জেলখানা ঘাট থেকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার হাঁটলেই পৌঁছানো যায় সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ এলাকায়। যমুনা নদীর ভাঙন থেকে শহর রক্ষার জন্য নির্মিত এই বাঁধ বর্তমানে একটি জনপ্রিয় ভ্রমণস্থল।
এখানে রয়েছে স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ এবং ‘লাভ সিরাজগঞ্জ’ নামের ফটোগ্রাফি স্পট। নদীর তীর ধরে হাঁটা, ছবি তোলা এবং নদীর দৃশ্য উপভোগ করার জন্য দর্শনার্থীরা এখানে ভিড় করেন। প্রবেশ ফি নেই এবং জায়গাটি সবসময় উন্মুক্ত।
চায়না বাঁধে নৌভ্রমণ
পুরাতন জেলখানা ঘাট অথবা হার্ডপয়েন্ট থেকে নৌকায় প্রায় ২০ মিনিটে পৌঁছানো যায় চায়না বাঁধ এলাকায়। নৌকা ভাড়া জনপ্রতি প্রায় ৪০ টাকা, যা যাওয়া আসা মিলিয়ে। ঈদের সময় ভাড়া কিছুটা বাড়তে পারে।
ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নৌভ্রমণের জন্য সময়টি সবচেয়ে ভালো। নদীর কোলঘেঁষা পরিবেশ, পিচঢালা বাঁধের রাস্তা এবং চারপাশের শান্ত প্রকৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
যমুনা সেতু ও যমুনা রেলসেতু
নদীপথে নৌকা ভ্রমণ করে কাছ থেকে দেখা যায় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো যমুনা সেতু। কাছেই নির্মাণাধীন বা সম্প্রসারিত রেলপথের জন্য রয়েছে যমুনা রেল সেতু।
পুরাতন জেলখানা ঘাট বা চায়না বাঁধ থেকে নৌকায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে এই সেতুগুলো দেখা যায়। নৌকা ভাড়া জনপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা। নদীর মাঝখান থেকে বিশাল সেতুর দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
রবীন্দ্র কাছারি বাড়ি ও জাদুঘর
সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ রবীন্দ্র কাছারি বাড়ি। এটি অবস্থিত শাহজাদপুর এলাকায়, যা জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে।
১৮৪২ সালে এই ভবনটি ক্রয় করেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। পরে ১৮৯০ থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত এখানে অবস্থান করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই সময় তিনি এখানেই বহু সাহিত্যকর্ম রচনা করেন।
জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে কবির ব্যবহৃত আসবাবপত্র, আলোকচিত্র, পালকি এবং বিভিন্ন স্মারক। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা জাদুঘর ঘুরে দেখতে পারেন। রবিবার বন্ধ থাকে। দেশি দর্শনার্থীদের টিকিট ২০ টাকা।
সলপের ঘোল ও ঘাটিনা রেলব্রিজ
ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য পরিচিত সলপ এলাকা। এখানকার বিখ্যাত পানীয় ‘সলপের ঘোল’ প্রায় শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য বহন করছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তাজা দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি এই ঘোল চিড়া বা মুড়ির সঙ্গে খেতে বিশেষ জনপ্রিয়।
কাছেই রয়েছে ঐতিহাসিক ঘাটিনা রেলব্রিজ, যা উল্লাপাড়া উপজেলার ফুলজোড় নদীর ওপর নির্মিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই এলাকার গুরুত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য। এখনো এর স্থাপত্য এবং আশপাশের প্রকৃতি ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে।
আল আমান বাহেলা খাতুন জামে মসজিদ ও এনায়েতপুর বাঁধ
স্থাপত্য সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত আল আমান বাহেলা খাতুন জামে মসজিদ। এটি জেলা শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মসজিদটি সবসময় দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
রাতে আলোকসজ্জার কারণে মসজিদের সৌন্দর্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এখান থেকে কাছেই রয়েছে এনায়েতপুর বেরিবাঁধ। নদীর পাড়ের শান্ত পরিবেশ উপভোগ করতে অনেকেই এখানে আসেন।
নবরত্ন মন্দির
প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির অবস্থিত হাটিকুমরুল এলাকায়। জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরে এই মন্দির।
সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা এখানে প্রবেশ করতে পারেন। প্রবেশমূল্য নেই এবং মন্দির প্রাঙ্গণে ছবি তোলার সুযোগ রয়েছে। প্রাচীন স্থাপত্যের জন্য এটি ফটোগ্রাফারদের কাছেও জনপ্রিয় একটি স্থান।