প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, পাহাড়ি ভূদৃশ্য, বিস্তীর্ণ হাওর, নদীনির্ভর জীবন ও সমৃদ্ধ সাহিত্যঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নেত্রকোনা আজও দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনভূমি। কিন্তু সমন্বিত পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিবেশসংরক্ষণভিত্তিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এই সম্ভাবনা বাস্তব রূপ পাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে জেলার প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

জেলার মোহনগঞ্জ, মদন ও খালিয়াজুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল বর্ষা মৌসুমে রূপ নেয় এক বিশাল জলরাশিতে। বিশেষ করে ডিঙ্গাপোতা হাওর এবং ধনু নদী ঘিরে নৌভ্রমণ পর্যটকদের জন্য হয়ে উঠতে পারে বড় আকর্ষণ। শীতকালে অতিথি পাখির আগমন এই অঞ্চলকে দেয় ভিন্ন মাত্রা। তবে নিরাপদ নৌযান, জেটি, প্রশিক্ষিত মাঝি, গাইড ও আবাসন সুবিধার অভাবে হাওরভিত্তিক পর্যটন এখনো অনিয়ন্ত্রিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।

বর্ষাকালে খালিয়াজুরীর অধিকাংশ এলাকা পানিবন্দী হয়ে পড়ে। নৌকানির্ভর যোগাযোগ, ভাসমান গ্রাম ও পানির মধ্যে ফসলি জমির দৃশ্য প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের বিরাট সম্ভাবনা তৈরি করলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সেই সম্ভাবনাকে আটকে রেখেছে। একই সঙ্গে অকাল বন্যা ও নদীভাঙন স্থানীয় জীবনে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।

পাহাড়ি জনপদ দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড় জেলার সবচেয়ে পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন পর্যটকের ভিড় থাকলেও অপরিকল্পিত ভ্রমণ, নজরদারির অভাব এবং অতীতে নির্বিচারে মাটি উত্তোলনের কারণে পাহাড়ধস ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়েছে। পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার অভাবে এই স্পট এখন ঝুঁকির মুখে।

একই উপজেলার সোমেশ্বরী নদী স্বচ্ছ পানি ও পাহাড়ঘেরা সৌন্দর্যের জন্য সুপরিচিত। নৌভ্রমণ ও প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটনের জন্য উপযোগী হলেও নিরাপত্তা ও অবকাঠামো ঘাটতি সম্ভাবনাকে সীমিত করে রেখেছে।

অন্যদিকে কলমাকান্দা উপজেলার পাতলাবন অঞ্চল গারো জনগোষ্ঠীর বসবাস ও সংস্কৃতির কারণে সাংস্কৃতিক পর্যটনের অনন্য ক্ষেত্র হতে পারে। মাতৃতান্ত্রিক পারিবারিক কাঠামো, ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও লোকসংস্কৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো সম্পদ। কিন্তু সড়ক যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পানীয় জলের সংকট এই সম্ভাবনার বিকাশে বাধা হয়ে আছে। একই উপজেলার মহাদেও নদী ঘিরে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অবহেলিত রয়ে গেছে।

ঐতিহাসিক ও সাহিত্যভিত্তিক পর্যটনেও পিছিয়ে নেই নেত্রকোনা। কেন্দুয়া অঞ্চলে ব্রিটিশ আমলের অর্থমন্ত্রী নলিনী সরকার-এর পৈতৃক বাড়ি এবং বারহাট্টা উপজেলার কাশতলায় কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর স্মৃতিবিজড়িত ভিটা রয়েছে। পাশাপাশি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ-এর পৈতৃক নিবাস ও প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাহিত্যনির্ভর পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারত। কিন্তু অধিকাংশ স্থাপনাই এখনো সংরক্ষণ ও পর্যটকবান্ধব ব্যবস্থার বাইরে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলার প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনার অভাব, দুর্বল সড়ক ও নৌ যোগাযোগ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও আবাসনের সংকট, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর নজরদারির ঘাটতি।

নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংযুক্তা পাল বলেন, সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে নেত্রকোনা হাওর ও পাহাড়কেন্দ্রিক টেকসই পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণও সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. আরিফুল ইসলাম সরদার জানান, জেলার সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকাগুলো চিহ্নিত করে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ এবং ধাপে ধাপে বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে নেত্রকোনার পর্যটন খাতকে সক্রিয় করার উদ্যোগ চলছে।