মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের ঘনঘটা। ইরান ভূখণ্ডে আমেরিকা এবং ইসরায়েলের অতর্কিত বিমান হামলার পর থেকে পুরো অঞ্চলের মানচিত্র যেন এক লহমায় বদলে গেছে। কিন্তু এই সংঘাত কেবল সীমান্তের কাঁটাতার বা সামরিক ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ নেই; এর আঁচ এসে লেগেছে বৈশ্বিক পর্যটন এবং বিমান চলাচল খাতে। এক নিমিষেই স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম ট্রাভেল হাব বা আকাশপথের সংযোগস্থলগুলো।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লের দিকে তাকালে আজ এক বিষণ্ণ ছবি চোখে পড়ে। যেখানে প্রতি মিনিটে পৃথিবীর নানা প্রান্তের ফ্লাইটের ওঠানামা করার কথা, সেখানে এখন কেবল 'বাতিল' বা 'স্থগিত' সংকেতের লাল অক্ষরে ছেয়ে গেছে পর্দা। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন থেকে শুরু করে জর্ডান ও সৌদি আরব—ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় একে একে বন্ধ হয়ে গেছে সব দেশের আকাশপথ। এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ এবং ইতিহাদ-এর মতো বিশ্বসেরা বিমান সংস্থাগুলো তাদের সমস্ত অপারেশন স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
সংকটের গভীরতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে যখন বাহরাইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার খবর আসে। কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে যাত্রী ও কর্মীদের সরিয়ে নিলেও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন রয়ে গেছে রানওয়েতে। আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এয়ার ফ্রান্সের মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোও তেল আবিব, বৈরুত ও রিয়াদের ফ্লাইট আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে। এর প্রভাব কেবল বিমানবন্দরেই নয়, বিশ্বের বড় বড় ডিউটি ফ্রি রিটেইল শপগুলোতেও পড়েছে। জেদ্দা বা দুবাইয়ের মতো ব্যস্ত শপিং জোনগুলো আজ ক্রেতাশূন্য, জনমানবহীন।
ব্যবসায়িক ক্ষতির চেয়েও এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের নিরাপত্তা। এআরআই (ARI) এবং হাইনম্যান (Heinemann)-এর মতো বড় রিটেইল জায়ান্টরা তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দুবাইয়ে অবস্থিত হাইনম্যানের আঞ্চলিক সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এখন যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে থাকা সহকর্মীদের জীবন রক্ষা করা। অনিশ্চয়তার এই মেঘ কতদিন স্থায়ী হবে, তা কেউ জানে না। প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে এক অজানা আতঙ্কে।
২রা মার্চ সকাল ১১টা। কাতার এয়ারওয়েজের সর্বশেষ আপডেট বলছে, আকাশপথ এখনো বন্ধ। দোহা, দুবাই কিংবা রিয়াদের ট্রানজিট লাউঞ্জগুলোতে আজ কোনো কোলাহল নেই। এই নিস্তব্ধতা কেবল একটি খাতের ব্যবসার ক্ষতি নির্দেশ করে না, বরং এটি জানান দেয় যে আধুনিক বিশ্ব কতটা ভঙ্গুর। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন কেবল আকাশপথই বন্ধ হয় না, বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় হাজারো মানুষের জীবন আর স্বপ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট কবে কাটবে, সেই উত্তরের অপেক্ষায় এখন গোটা বিশ্ব।