বসন্তের শুরুতেই অস্বাভাবিক নীরবতায় ঢেকে গেছে দেশের প্রধান সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার। মৌসুমের শেষভাগে যেখানে পর্যটকের ভিড় থাকার কথা, সেখানে এখন হোটেল, সৈকত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানজুড়ে বিরাজ করছে স্থবিরতা। বড় ধরনের মূল্যছাড় দিয়েও পর্যটক টানতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। ফলে কর্মসংস্থান হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো শ্রমজীবী মানুষ।

ছাড় দিয়েও মিলছে না অতিথি

রমজান উপলক্ষে হোটেল ও মোটেলগুলোতে কক্ষভাড়ায় সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবু অধিকাংশ আবাসন প্রতিষ্ঠান প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগ থেকেই পর্যটকের সংখ্যা কমতে শুরু করে। ১৯ ফেব্রুয়ারি রমজান শুরু হওয়ার পর তা নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোটায়। বর্তমানে গড়ে মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ কক্ষ ব্যবহার হচ্ছে।

পর্যটকশূন্য সৈকতে থমকে ক্ষুদ্র ব্যবসা

কলাতলী, ঝিনুক মার্কেট ও শুটকি মার্কেটসহ পর্যটকনির্ভর এলাকার অনেক দোকান দিনের বেলায়ই বন্ধ থাকছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সৈকতসংলগ্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

সুগন্ধা পয়েন্টে দেখা যায়, পর্যটকদের বসার জন্য সাজানো অধিকাংশ চেয়ার খালি পড়ে আছে। কিটকট দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা আব্দুল্লাহ জানান, মৌসুমে প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় হলেও এখন ৫০০ টাকাও হচ্ছে না।

হোটেল খাতে কর্মসংকট

শহরের একটি চারতারকা মানের হোটেলের কক্ষসেবা কর্মী মোহাম্মদ রিয়াজ জানান, কাজ না থাকায় তাকে নামমাত্র বেতন দিয়ে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। সেবামূল্য না পাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

তার ভাষায়, রমজানে আয় নেই, বেতনে পরিবার চলে না। ঈদের সময় কীভাবে চলবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

আরেক কর্মী ইমরান হোসেন সাময়িকভাবে নিজ গ্রামে ফিরে গেছেন। তিনি বলেন, এই সময়ে পারিবারিক কৃষিকাজে যুক্ত আছেন। মৌসুম শুরু হলে আবার কর্মস্থলে ফিরবেন।

সীমিত জনবল নিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠান

মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন একটি রিসোর্টের কর্মকর্তা জানান, স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ৪২ জন কর্মীর মধ্যে অনেককেই সাময়িক ছুটিতে রাখা হয়েছে। কিছু অগ্রিম অর্থ দেওয়া হয়েছে এবং ঈদ উপলক্ষে ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সুগন্ধা এলাকার একটি হোটেলের ব্যবস্থাপক বলেন, সমুদ্রদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও অর্ধেকেরও কম ভাড়ায় কক্ষ দিতে হচ্ছে। তবুও প্রতিদিন বহু কক্ষ খালি থাকছে।

হোটেল-মোটেল মালিকদের সংগঠনের নেতারা জানান, এটি প্রকৃতপক্ষে পর্যটনের অফ-মৌসুম। শহরের পাঁচ শতাধিক আবাসিক প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কর্মী ছুটিতে আছেন। এই সময় ভবন সংস্কার, রঙ করা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চালানো হয়।

প্রকৃতি ফিরে পাচ্ছে নিজের ছন্দ

মানুষের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বালিয়াড়িতে বেড়েছে সাগরলতা নামে পরিচিত উপকূলীয় উদ্ভিদ, যা বালু ধরে রেখে ক্ষয়রোধে সহায়তা করে।

পরিবেশবিদরা বলেন, এই উদ্ভিদ সৈকতের বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বালিয়াড়ি গঠনে ভূমিকা রাখে এবং ঝড়ের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে।

সৈকতে মাছ ধরার ট্রলার সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় ভিন্নধর্মী দৃশ্য তৈরি হয়েছে। পর্যটক না থাকলেও স্থানীয়দের কেউ কেউ নিয়মিত সকালে হাঁটতে আসছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ মহসিন জানান, ছোটবেলায় সৈকতের বড় অংশজুড়ে এই সাগরলতা দেখা যেত। এখন তা কমে গেলেও নিরিবিলি সময়ে আবারও প্রকৃতির সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।

ঈদের পর ঘুরে দাঁড়ানোর আশা

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে আবার পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে এবং নতুন মৌসুম শুরু হবে।

স্থানীয়দের মতে, পর্যটন শিল্প টিকিয়ে রাখতে অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকতের স্বকীয়তা রক্ষা করেই পর্যটন বিকাশ ঘটাতে হবে।