বাংলার কলম্বাস ডেস্ক
পৃথিবীর বুকে এমন এক জায়গা আছে, যেখানে শীতের তীব্রতা কল্পনারও অতীত। যেখানে নিশ্বাস ছাড়লে বরফ হয়ে ঝরে পড়ে এবং তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেতে পারে।
রাশিয়ার ইয়াকুতিয়া বা সাখা প্রজাতন্ত্রের অন্তর্গত একটি ছোট গ্রাম ওইমিয়াকন। একে বলা হয় পৃথিবীর শীতলতম জনবসতি বা 'পোল অব কোল্ড’।
![]()
হিমশীতল ভূপ্রকৃতি ও তাপমাত্রা
ওইমিয়াকন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শীতকালে এখানকার গড় তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। ১৯৩৩ সালে এখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল মাইনাস ৬৭.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তবে স্থানীয়দের মতে এটি কখনও কখনও মাইনাস ৭০ ডিগ্রিও স্পর্শ করে।
এই প্রচণ্ড ঠান্ডায় সাধারণ কোনো পদার্থের স্বাভাবিক ধর্ম বজায় থাকে না। এমনকি অ্যালকোহল, যা সাধারণত অনেক কম তাপমাত্রায় জমে, তাও এখানে বরফে পরিণত হতে পারে।
![]()
জীবনযাত্রার চ্যালেঞ্জ
প্রকৃতির এই রুক্ষতার সঙ্গে লড়াই করেই ওইমিয়াকনের প্রায় ৫০০ বাসিন্দা টিকে আছেন। এখানকার জীবনযাপন পৃথিবীর অন্য যে কোনো প্রান্তের চেয়ে আলাদা।
খাদ্যাভ্যাস
অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে এখানে কোনো ফসল ফলে না। বাসিন্দারা মূলত ঘোড়া ও রেইনডিয়ারের মাংস এবং মাছ খেয়ে জীবনধারণ করেন। এখানকার মানুষ কাঁচা হিমায়িত মাছ খেতে অভ্যস্ত, যা তাদের শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়।
পরিবহন ও যান্ত্রিক সমস্যা
এখানে গাড়ি চালানো এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। ইঞ্জিন বন্ধ করলে তেল জমে যাওয়ার ভয়ে বাসিন্দারা সারাক্ষণ গাড়ির ইঞ্জিন চালু রাখেন। এমনকি ব্যাটারি বা যন্ত্রাংশ অতিরিক্ত ঠান্ডায় অকেজো হয়ে পড়ে।
![]()
প্রাত্যহিক অসুবিধা
এখানকার মাটি সবসময় জমে শক্ত হয়ে থাকে, তাই ঘরবাড়িতে ইনডোর প্লাম্বিং বা পানির পাইপলাইন বসানো প্রায় অসম্ভব। টয়লেটগুলো সাধারণত ঘরের বাইরে তৈরি করতে হয়। কলমের কালি জমে যাওয়া থেকে শুরু করে চশমার ফ্রেম মুখে আটকে যাওয়া— সবই এখানকার নৈমিত্তিক ঘটনা।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি
সাধারণত বিশ্বের অন্যান্য দেশে সামান্য তুষারপাতেই স্কুল বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু ওইমিয়াকনের শিশুরা মাইনাস ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও স্কুলে যায়। এর নিচে তাপমাত্রা নামলে কেবল প্রাথমিক স্তরের ক্লাস ছুটি দেওয়া হয়। বাসিন্দাদের প্রধান পেশা হলো পশুপালন, শিকার ও মাছ ধরা।
কেন পর্যটকদের টানে?
এত প্রতিকূলতার পরেও ওইমিয়াকন এখন পর্যটকদের কাছে রহস্যময় গন্তব্য। চরম রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষরা এই মাইনাস ৭০ ডিগ্রির অভিজ্ঞতা নিতে এখানে ছুটে আসেন। পর্যটকদের জন্য এখানে 'শীতলতম স্থানে ভ্রমণের সনদ'ও দেওয়া হয়।
![]()
ওইমিয়াকন এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা কতটা বিস্ময়কর। যেখানে সাধারণ জনজীবন স্থবির হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে একদল মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সন্ধি করে যুগ যুগ ধরে টিকে আছে। এটি কেবল একটি গ্রাম নয়, বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়যাত্রার এক জীবন্ত নিদর্শন।