পরিত্যক্ত ভবন কিংবা অবকাঠামোর মধ্যে খালি পড়ে থাকা কোনো ক্রীড়া স্টেডিয়ামের দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি ভৌতিক মনে হতে পারে। আর সেটি যদি হয় একটি ফুটবল স্টেডিয়াম, তাহলে সেই দৃশ্য আরও বেদনাদায়ক।
আজারবাইজানের ইমারাত স্টেডিয়াম এমনই একটি জায়গা। এটি শুধু একটি পরিত্যক্ত মাঠ নয়; বরং দেশটির জন্য একটি তিক্ত ও বেদনাদায়ক সংঘাতের স্মারক। তিন দশকেরও বেশি সময় পরও যার স্মৃতি ও ক্ষত আজও মানুষের মনে রয়ে গেছে। খবর: ইউরো নিউজ
এই স্টেডিয়াম ছিল কারাবাখ এফকে-এর ঘর। ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাব প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নেওয়া আজারবাইজানের সবচেয়ে সফল ফুটবল ক্লাবগুলোর একটি কারাবাখ। কিন্তু অনেকেই জানেন না, কেন দলটি নিজেদের শহর থেকে প্রায় ১৫০ মাইল দূরে রাজধানী বাকুতে খেলতে বাধ্য হয়। 
কারণ, তাদের আসল বাড়ি আগদাম। নাগর্নো-কারাবাখ অঞ্চলের এই শহরটি ছিল মূলত আজারবাইজানিদের বসতি। চার দশকেরও বেশি সময় ইমারাত স্টেডিয়ামেই খেলেছে কারাবাখ। সর্বশেষ ১৯৯৩ সালের ১২ মে ঘরের মাঠে তুরান তোভুজকে ১–০ গোলে হারিয়ে তারা ঘর ছাড়ে।
ততদিনে ফুটবলও যুদ্ধের ছায়ায় চলে গিয়েছিল। আগদাম ব্যাপক গোলাবর্ষণের শিকার হচ্ছিল। খেলোয়াড়দের আগেই কাছের মিনগেচেভির শহরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে বাসে করে তাদের ম্যাচ খেলতে আসতে হতো।
এর মাত্র দুই মাস পর শহরটি আর্মেনীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বিপুলসংখ্যক মানুষ পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। শহরের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়, যার মধ্যে ছিল ইমারাত স্টেডিয়ামও।


পরবর্তী বছরগুলোতে স্টেডিয়ামের ধ্বংসাবশেষের ছবি সামনে আসে। গ্যালারির কিছু অংশ ধসে পড়ে, চারপাশে গজিয়ে ওঠে গাছপালা। শেষ পর্যন্ত মাঠের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট ছিল না—শুধু সবুজের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ছিল পুরোনো পিচের আকৃতি।
কারাবাখের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা তখন শরণার্থীতে পরিণত হন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় খেলার পর শেষ পর্যন্ত তারা বাকুতে অস্থায়ী ঠিকানা খুঁজে নেয়। পরে ২০০১ সালে বিনিয়োগ পাওয়ার পর ক্লাবটির সাফল্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
২০১৩–১৪ মৌসুম থেকে আজারবাইজান লিগে টানা সাফল্য পেতে থাকে কারাবাখ। তারা ১১ বার লিগ শিরোপা জেতে এবং ইউরোপীয় ফুটবলেও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তারা বেনফিকাকে হারিয়েছে এবং চেলসি ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের মতো দলের সঙ্গে ড্র করেছে।
কিন্তু সাফল্যের মধ্যেও পুরোনো বাড়িতে ফেরার আকাঙ্ক্ষা কখনো শেষ হয়নি।
২০২০ সালের নভেম্বরে দ্বিতীয় নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধের পর আজারবাইজান আগদামের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। ফিরে আসে ইমারাত স্টেডিয়ামও।
এখন আগদামে ফিরতে প্রস্তুত কারাবাখ। তবে পুরোনো মাঠে নয়। জায়গাটি পুনরুদ্ধার ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রকল্পের অংশ হবে। কাছেই তৈরি হচ্ছে নতুন ইমারাত স্টেডিয়াম। ২০২৮ সালের শেষ দিকে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা, যেখানে ২০২৯ সাল থেকে প্রায় ১১ হাজার ৭০০ দর্শক কারাবাখের খেলা দেখতে পারবেন।
পুরোনো মাঠটি তাই আর শুধু একটি ফুটবল পিচ নয়। এটি যুদ্ধের কারণে থেমে যাওয়া জীবন, হারিয়ে যাওয়া মানুষ এবং তিন দশকেরও বেশি সময় শরণার্থী হয়ে থাকা একটি ফুটবল ক্লাবের স্মৃতি। আর এখন, সেই স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়েই কারাবাখ ও আগদাম এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।