দেশের প্রধান সমুদ্র পর্যটন নগরী কক্সবাজারে তীব্র গরম ও উচ্চ আর্দ্রতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পর্যটন খাতে। দিনের বেলায় সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায় দেখা দিয়েছে মন্দাভাব। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে পর্যটননির্ভর অর্থনীতির বিভিন্ন খাত আর্থিক চাপে পড়তে পারে।

গত কয়েকদিন ধরে কক্সবাজারে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও বাতাসে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ আর্দ্রতার কারণে গরমের তীব্রতা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। ফলে দিনের বেশিরভাগ সময় পর্যটকদের অনেকেই হোটেল কক্ষে অবস্থান করছেন।

সরেজমিনে লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকত এলাকায় দেখা যায়, দুপুরের পর সৈকতে মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে কিছুটা ভিড় বাড়লেও দিনের বড় একটি সময় ব্যবসা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে।

সুগন্ধা সৈকত এলাকার উপহারসামগ্রী বিক্রেতা মোহাম্মদ আয়াত উল্লাহ বলেন, পর্যটক থাকলেও প্রচণ্ড গরমের কারণে দিনের বেলায় দোকানে ক্রেতা কম আসছেন। ফলে বিক্রি আগের তুলনায় কমে গেছে। ঝিনুক ও হস্তশিল্প ব্যবসায়ী শাহীন আলমও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন।

পর্যটননির্ভর খুচরা ব্যবসা, পোশাক, কসমেটিকস, স্থানীয় পণ্য ও স্মারকসামগ্রীর দোকানগুলো সরাসরি পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটক কমে যাওয়ায় এসব ব্যবসায় বিক্রির পরিমাণও কমছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন মৌসুমি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।

খাবার হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরাও বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছেন। তাদের মতে, পর্যটক কমলে খাবারের চাহিদা হ্রাস পায়, কিন্তু বিদ্যুৎ, কর্মচারী ও খাদ্য সংরক্ষণের ব্যয় ঠিকই বহন করতে হয়। একইভাবে হোটেল ও রিসোর্টগুলোকে সার্বক্ষণিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রাখতে হওয়ায় পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে।

সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবস্থাও কঠিন। ডাব বিক্রেতা, ফটোগ্রাফার, বিচ বাইক পরিচালনাকারী, ঘোড়ার মালিক এবং অস্থায়ী দোকানিরা বলছেন, পর্যটকের উপস্থিতি কমলেই তাদের আয় সরাসরি কমে যায়।

পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টমটম, পর্যটকবাহী জিপ ও ভাড়াভিত্তিক যানবাহনের চালকদের দাবি, দুপুরের দিকে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। আগে যেসব পর্যটক সকালে ইনানী, হিমছড়ি ও মেরিন ড্রাইভ ভ্রমণে যেতেন, এখন তাদের অনেকেই হোটেলে অবস্থান করছেন।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত গরমের কারণে পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে, খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। সৈকত পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কুলি, ভ্যানচালক ও অস্থায়ী বিক্রেতারা বলছেন, তীব্র রোদে কাজের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং আয়ও হ্রাস পাচ্ছে।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. শাহীন আব্দুর রহমান চৌধুরী জানান, অতিরিক্ত গরমে হিট এক্সহস্টশন ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি পর্যাপ্ত পানি পান, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে ভারী কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন।

এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানিয়েছেন, আগামী কয়েকদিন আকাশে মেঘের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে তাপমাত্রা কিছুটা কমে স্বস্তি ফিরতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারের অর্থনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই তাপপ্রবাহ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই নয়, পুরো পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতেই পড়তে পারে।