ঈদের সরকারি ছুটি শেষ হলেও খাগড়াছড়ির পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে কমেনি ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভিড়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে জেলার জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলো। পর্যটকদের এই অব্যাহত সমাগমে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যটননির্ভর অর্থনীতি। হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, কৃষিপণ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ নানা খাতের উদ্যোক্তাদের মুখে ফিরেছে স্বস্তির হাসি।
সরেজমিনে আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র, আলুটিলা প্রাকৃতিক গুহা, রিছাং ঝরনা এবং খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ পার্ক ঘুরে দেখা যায়, সকাল ও বিকেলের দিকে পর্যটকদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। দুপুরের গরমে ভিড় কিছুটা কমলেও দিনজুড়েই পর্যটকদের আনাগোনা অব্যাহত রয়েছে।
খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ পার্কের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা কান্তি ত্রিপুরা বলেন, ঈদের ছুটি শেষ হলেও প্রত্যাশিত সংখ্যক পর্যটক এখনও পার্কে আসছেন। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পার্কের বিভিন্ন স্পট দৃষ্টিনন্দনভাবে সাজানো হয়েছে। বিস্তীর্ণ সবুজ পরিবেশ, লেক, ফুলের বাগান ও ঝুলন্ত সেতুর কারণে গরমের প্রভাব তুলনামূলক কম অনুভূত হয়। ফলে দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারেন।
তিনি আরও জানান, জেলা পরিষদ পার্ক পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হলেও আলুটিলা, রিছাং ঝরনা, দেবতার পুকুর ও মায়াবিনী লেকসহ জেলার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানও সমান জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও পর্যটকদের এই উপস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
গাইরিং হোটেলের মালিক অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ঈদের আগে ও পরে ব্যাপক পর্যটক সমাগম হওয়ায় হোটেল ব্যবসাসহ পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হয়েছেন। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ব্যবসায় আরও গতি আসবে।
হোটেল অরণ্য বিলাসের ম্যানেজার আবদুর রশিদ সাগর জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া পর্যটকের চাপ এখনও অব্যাহত রয়েছে। পর্যটকদের আগমনে জেলার শতাধিক হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউসের পাশাপাশি পরিবহন ব্যবসায়ী, রেস্তোরাঁ মালিক এবং স্থানীয় কৃষকরাও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। সবজি ব্যবসায়ী আবদুর রহিম জানান, ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে শাক-সবজি, মাছ ও মাংসের চাহিদা বেড়েছে। ফলে ব্যবসা জমে উঠেছে।
তবে পর্যটকদের একাংশ পরিবহন ভাড়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক হাসান মাহমুদ, কুমিল্লার লাকসামের রুহুল আমিন এবং চট্টগ্রামের সাবিনা আক্তার বলেন, খাগড়াছড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাদের মুগ্ধ করেছে। তবে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতের ভাড়া তুলনামূলক বেশি। তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
এ বিষয়ে পার্বত্য যানবাহন মালিক কল্যাণ সমিতির নেতা ও চালক সুমন চাকমা বলেন, খাগড়াছড়ির অভ্যন্তরীণ পর্যটনকেন্দ্র এবং রাঙামাটির সাজেকগামী পর্যটকদের সেবায় প্রায় দুই শতাধিক যানবাহন নিয়মিত চলাচল করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে, ফলে ভাড়া কমানোর সুযোগ নেই।
জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত বলেন, খাগড়াছড়ির সার্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি পর্যটনবান্ধব। তিনি দেশি পর্যটকদের ‘প্রকৃতির রানী’ হিসেবে পরিচিত খাগড়াছড়ি ভ্রমণের আহ্বান জানান।
পরিবহন ভাড়া নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভাড়া কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক। তবে কেউ অযৌক্তিক বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মোরতাজা আলী খান।
তিনি বলেন, জেলার সব পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। কোনো পর্যটক সমস্যার সম্মুখীন হলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।