ভ্রমণ মানেই শুধু গন্তব্য নয়, অনেক সময় যাত্রাটাই হয়ে ওঠে মূল গল্প। আকাশপথের দ্রুততা কিংবা সড়কপথের সুবিধার ভিড়ে আজও ট্রেন ভ্রমণের প্রতি মানুষের আলাদা টান রয়ে গেছে। জানালার পাশে বসে বদলে যাওয়া দৃশ্য, ট্রেনের ছন্দময় শব্দ আর ধীর গতির যাত্রা অনেকের কাছেই এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন কিছু ট্রেন রয়েছে, যেগুলো কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং নিজের মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ট্রাভেল ভ্লগ ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও বিলাসবহুল ট্রেনযাত্রাগুলোর কথা উঠে এসেছে। সেই তালিকা থেকে বাছাই করা পাঁচটি ব্যতিক্রমী ট্রেন ভ্রমণের গল্প তুলে ধরা হলো।
ব্রিটিশ পুলম্যান, ইংল্যান্ড
লন্ডন থেকে যাত্রা শুরু করা ব্রিটিশ পুলম্যানকে বলা হয় সময়কে পেছনে ফিরিয়ে নেওয়ার ট্রেন। ১৯২২ থেকে ১৯৩০ সালের আর্ট ডেকো নকশায় সাজানো প্রতিটি কোচে রয়েছে পালিশ করা কাঠ, ভিনটেজ আসবাব আর নরম আলো। পুরো পরিবেশে রাজকীয় এক আবহ তৈরি হয়।
যাত্রাপথে কেমব্রিজ, ইয়র্ক ও ক্যান্টারবারির সবুজ গ্রামাঞ্চল, খোলা মাঠ আর ঐতিহাসিক স্থাপনা চোখে পড়ে। খাবার পরিবেশনেও বজায় রাখা হয় ব্রিটিশ ঐতিহ্য। অনেক যাত্রীর মতে, এই ট্রেনে ভ্রমণ মানে শুধু দৃশ্য দেখা নয়, বরং একটি সময়কালকে অনুভব করা।
রকি মাউন্টেনিয়ার, কানাডা
বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল ব্যক্তিমালিকানাধীন ট্রেন রকি মাউন্টেনিয়ার প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বপ্নের যাত্রা। কানাডার জ্যাস্পার ন্যাশনাল পার্ক থেকে শুরু করে পশ্চিম থেকে পূর্ব কানাডা পর্যন্ত বিস্তৃত এই রুটে দেখা মেলে তুষারঢাকা পাহাড়, জলপ্রপাত, হিমবাহ হ্রদ আর খরস্রোতা নদীর।
এই ট্রেনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর বিশাল কাচের জানালা, যা সিট থেকে ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে চারপাশের প্রকৃতি যেন চলমান সিনেমার মতো ভেসে ওঠে। এর সঙ্গে ট্রেনকর্মীদের আন্তরিক সেবা যাত্রাকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
ইস্টার্ন অ্যান্ড ওরিয়েন্টাল এক্সপ্রেস, সিঙ্গাপুর
ইস্টার্ন অ্যান্ড ওরিয়েন্টাল এক্সপ্রেসে পা রাখলেই বোঝা যায়, এটি সাধারণ কোনো ট্রেন নয়। চকচকে কাঠের প্যানেল, সিল্কের পর্দা আর নান্দনিক আলোয় সাজানো এই ট্রেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম আইকনিক ভ্রমণ মাধ্যম।
সিঙ্গাপুর থেকে ব্যাংকক পর্যন্ত চলা এই যাত্রায় উনিশ ও বিশ শতকের নকশা ও সেবার ছোঁয়া যাত্রীদের আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে নিয়ে যায়। অনেকেই বলেন, এই ট্রেনে সময়ের হিসাবটাই যেন হারিয়ে যায়।
অ্যান্ডিয়ান এক্সপ্লোরার, পেরু
দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম বিলাসবহুল স্লিপার ট্রেন অ্যান্ডিয়ান এক্সপ্লোরার পেরুর পুনো শহর থেকে কুসকো পর্যন্ত চলাচল করে। প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই রেলপথ বিশ্বের অন্যতম উঁচু রুটের একটি।
মাত্র ৩৫টি কেবিন থাকায় যাত্রীরা পান ব্যক্তিগত ও আরামদায়ক অভিজ্ঞতা। চারপাশে বিস্তীর্ণ মালভূমি, পাহাড় আর টিটিকাকা হ্রদের আশপাশের দৃশ্য এই ভ্রমণকে করে তোলে অনন্য ও শ্বাসরুদ্ধকর।
মহারাজা এক্সপ্রেস, ভারত
ভারতের সবচেয়ে বিলাসবহুল ট্রেনগুলোর একটি মহারাজা এক্সপ্রেস রাজকীয়তার প্রতীক। দিল্লি, রাজস্থানসহ ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও পর্যটন শহর নিয়ে সাজানো এই ট্রেনের রুট।
ট্রেনের ভেতরের নকশা, ডাইনিং এরিয়া, লাউঞ্জ আর বেডরুম সবই পাঁচ তারকা হোটেলের মানের। এই ট্রেনে ভ্রমণ করলে অনেক যাত্রীই বলেন, সত্যিই নিজেকে কোনো মহারাজার মতো মনে হয়।