প্রকৃতির নীরবতা আর সবুজের টানে ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় বাড়ছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। তবে এই বাড়তি উপস্থিতিই এখন বনের প্রাণীকুলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে। পর্যটকদের কোলাহল, যানবাহনের শব্দ এবং অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে বিঘ্নিত হচ্ছে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

রোববার উদ্যানের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক নাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রকৃতি উপভোগের জন্য এলেও অতিরিক্ত ভিড়ে সেই অভিজ্ঞতা পাওয়া যাচ্ছে না। বনের ভেতরে গাড়ির চাপ ও হর্নের শব্দ কমানো জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান সিলেট থেকে পরিবার নিয়ে আসা শর্মী আক্তার। তার মতে, উচ্চ শব্দ ও হইচইয়ের কারণে আগের মতো নিরিবিলি পরিবেশ আর নেই, যা হতাশাজনক।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষিত এই বনাঞ্চল ১ হাজার ২৫০ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত। এখানে রয়েছে ১৬৭ প্রজাতির গাছ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ অসংখ্য বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির আবাসস্থল।

তবে টানা ছুটিতে পর্যটকের ঢল পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ট্যুর গাইড ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২১ থেকে ২৩ মার্চ তিন দিনে ব্যাপক সংখ্যক দর্শনার্থী উদ্যানে প্রবেশ করেন। অনেকেই দল বেঁধে বনের ভেতরে উচ্চস্বরে কথা বলা ও হৈচৈ করেন, যা প্রাণীদের জন্য ক্ষতিকর।

এ ছাড়া বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কে যানবাহনের চাপও বেড়েছে। নির্ধারিত গতিসীমা ২০ কিলোমিটার থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। গাড়ির শব্দ ও মানুষের উপস্থিতিতে প্রাণীরা নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে অনেক পর্যটকই বন ঘুরে কোনো প্রাণীর দেখা পাচ্ছেন না।

সহব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তিন দিনে ৪ হাজার ৭৪২ জন পর্যটক উদ্যানে প্রবেশ করেন এবং ৫ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়।

পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটন প্রয়োজন হলেও তা হতে হবে নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মকানুন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না হলে লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী সোহেল শ্যাম বলেন, এই বন মূলত প্রাণীদের জন্য। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে লাউয়াছড়া তার স্বকীয়তা হারাবে।

একইভাবে পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিকরা মনে করছেন, অনিয়ন্ত্রিত ভিড় ও শব্দদূষণ প্রাণীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।