নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেঘনা নদীর ওপারে সবুজে ঘেরা শান্ত জনপদ পাড়াতলী। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের পৈতৃক ভিটা এই গ্রামেই। নদীর বুকে নৌভ্রমণ, গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্য, প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো মসজিদ, স্মৃতিবিজড়িত পুকুরঘাট ও কবির শৈশব-কৈশোরের শেকড়ের সন্ধান, সব মিলিয়ে পাড়াতলী হতে পারে ইতিহাস ও সাহিত্যপ্রেমী ভ্রমণপিপাসুদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য।

ঢাকা থেকে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য স্থানীয় যানবাহনে রায়পুরা উপজেলার পান্থশালা ঘাটে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে নৌকা কিংবা ফেরিতে মেঘনা নদী পেরিয়ে যেতে হয় ওপারে। নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে আমরা বেছে নিয়েছিলাম ছইওয়ালা নৌকা।

মেঘনার জলরাশি পেরিয়ে মনে পড়ে কবির লেখা পঙ্‌ক্তি:

‘মেঘনা নদী দেব পাড়ি
কল-অলা এক নায়ে।
আবার আমি যাব আমার
পাড়াতলী গাঁয়ে।’

নদী পেরিয়ে ওপারে নেমে উঠতে হয় স্থানীয় মোটরচালিত রিকশায়। পাকা ও ইটবিছানো আঁকাবাঁকা পথের দুই পাশে সবুজ গাছপালা, ফসলের মাঠ, ছোট বাজার ও গ্রামীণ জনপদ। প্রায় সাত কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় পাড়াতলীতে।

কবির পৈতৃক ভিটা বায়তুল আমান

গ্রামের অন্যতম আকর্ষণ কবি শামসুর রাহমানের পৈতৃক বাড়ি ‘বায়তুল আমান’। সাদা রঙের বাড়িটির প্রবেশপথে রয়েছে ইট-সিমেন্টের গেট ও কাঠের বড় দরজা। বাড়িটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৬৪ সালে।

বাড়ির ভেতরে প্রবেশের সুযোগ না থাকায় বাইরে থেকেই দেখতে হয় কবির স্মৃতিবিজড়িত এই বসতভিটা। কবি জীবনের শেষবার এখানে এসেছিলেন ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে। ২০০৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৪৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ

কবির পৈতৃক ভিটার উত্তর পাশে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বায়তুন নূর পাড়াতলী শাহি জামে মসজিদ। ১২৯৯ হিজরি সালে নির্মিত মসজিদটির বয়স প্রায় ১৪৮ বছর। তিনটি গম্বুজ ও ছোট একটি মিনারবিশিষ্ট মসজিদটি স্থানীয় স্থাপত্যঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

মসজিদের ভেতরের খিলান, নকশা করা মিম্বর এবং নীল, লাল ও সাদা রঙের ব্যবহার দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কবির আত্মীয়স্বজন দীর্ঘদিন ধরে মসজিদটির দেখভাল করে আসছেন।

পুকুরঘাটে কবির স্মৃতি

মসজিদের পাশেই রয়েছে গাছপালায় ঘেরা একটি পুকুর। এর পশ্চিম পাশে শানবাঁধানো ঘাট। পুকুরটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, কবির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতির কারণেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

১৯৭১ সালের ৭ বা ৮ এপ্রিল এই পুকুরপাড়ে বসেই শামসুর রাহমান লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত দুটি কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’। আত্মজীবনী ‘কালের ধুলোয় লেখা’য় তিনি এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।

এই পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবির ব্যক্তিগত শোকের স্মৃতিও। ১৯৭৬ সালে এখানে ডুবে মারা যায় তাঁর কিশোর ছেলে ওয়াহিদুর রাহমান, যাকে কবি আদর করে ‘মতিন’ বলে ডাকতেন।

পুকুরের পাশেই রয়েছে পারিবারিক কবরস্থান। সেখানে শায়িত আছেন কবির আত্মীয়স্বজন ও তাঁর ছেলে মতিন।