মানুষ পৃথিবীকে কীভাবে দেখেছে, বুঝেছে কিংবা কল্পনা করেছে— তার গল্প বলা যায় একটি গোলকের মাধ্যমেও। আর সেই গল্পের সবচেয়ে অসাধারণ সংগ্রহশালাগুলোর একটি রয়েছে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায়।
ভিয়েনার ১৭ শতকের ঐতিহাসিক পালাইস মোলার্ড ভবনের ভেতরে অবস্থিত গ্লোব মিউজিয়াম। এটি জনসাধারণের জন্য বিশ্বের একমাত্র উন্মুক্ত জাদুঘর, যেখানে সম্পূর্ণভাবে পৃথিবী ও মহাকাশের গ্লোব বা গোলককে কেন্দ্র করে সংগ্রহ গড়ে তোলা হয়েছে।
জাদুঘরটিতে রয়েছে ২২০টির বেশি দুর্লভ ও প্রাচীন গোলক; বেশির ভাগই তৈরি হয়েছে ১৮৫০ সালের আগে। বড় আকারের রাজকীয় গ্লোব থেকে শুরু করে ছোট, ভাঁজ করে বহন করা যায়—এমন পকেট গ্লোবও রয়েছে এখানে।
তবে এগুলো শুধু প্রাচীন মানচিত্র নয়। প্রতিটি গ্লোবই বলে মানুষ তার সময়কালে পৃথিবী সম্পর্কে কী জানত এবং কী জানত না।
১৬ শতকের দুটি গোলক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি পৃথিবীর মানচিত্র, অন্যটি মহাকাশের। সেসব মানচিত্রে আজকের পরিচিত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক অংশ তখনও ছিল অজানা। প্রশান্ত মহাসাগরে দ্বীপের বদলে দেখা যায় কাল্পনিক সামুদ্রিক দানব। কোথাও আবার অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকার জায়গায় দেখা যায় কল্পিত বিশাল ভূখণ্ড।
কিছু গ্লোব আবার সেই সময়ের ঔপনিবেশিক চিন্তাধারারও প্রতিফলন ঘটায়। আফ্রিকার উপকূলে স্পেন ও পর্তুগালের পতাকা আঁকা হয়েছে ‘অধিকার’ বোঝাতে। কোথাও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বিকৃত ও বৈষম্যমূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
জাদুঘরের আরেকটি আকর্ষণীয় নিদর্শন ১৯৬১ সালের একটি চন্দ্রগোলক। চাঁদের সামনের দিকটি নিখুঁতভাবে আঁকা হলেও পেছনের অংশটি ফাঁকা। কারণ তখনও চাঁদের সেই পাশ মানুষের চোখে দেখা হয়নি। মাত্র দুই বছর পর তৈরি নতুন গোলকে সেই অজানা অংশ যুক্ত করা হয়।
এখানে রয়েছে ১৪৯২ সালের বেহাইম গ্লোবের প্রতিরূপও। কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রার একই বছরে তৈরি এই গোলকে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা নেই—ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝে বিস্তীর্ণ সমুদ্র।
আজ গুগল আর্থে এক ক্লিকেই পুরো পৃথিবী দেখা যায়। তবুও এই পুরোনো গোলকগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান একদিনে তৈরি হয়নি। প্রতিটি নতুন আবিষ্কারের সঙ্গে বদলেছে আমাদের পৃথিবীর মানচিত্র, আর বদলেছে পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও।
ভিয়েনার এই জাদুঘর তাই শুধু গ্লোবের সংগ্রহশালা নয়; এটি পৃথিবীকে বোঝার ক্ষেত্রে মানবসভ্যতার দীর্ঘ অভিযাত্রার এক অনন্য দলিল।