প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ধাক্কা এবার সরাসরি এসে পড়েছে নেপালের পর্যটন খাতে। হড়পা বানের পর দেশটিতে নতুন ভ্রমণ বুকিং কমে যাওয়ার পাশাপাশি আগে থেকে করা সফরও বাতিল করছেন অনেক পর্যটক, এমন দাবি পর্যটন ব্যবসায়ীদের। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পর্যটননির্ভর নেপালের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নেপাল দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় একটি গন্তব্য। রাজধানী কাঠমান্ডু ও পোখরা লাগোয়া বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের পাশাপাশি অন্নপূর্ণা সার্কিট ও এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের মতো বিশ্বখ্যাত ট্রেকিং রুট প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক পাহাড়প্রেমীকে আকর্ষণ করে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকদের একটি বড় অংশ নেপালে ভ্রমণে যান। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে দেশটিতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে।

তবে সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর সেই চিত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পর্যটন সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, নতুন বুকিংয়ের গতি কমে গেছে এবং পুরোনো বুকিংও বাতিল হচ্ছে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকলে পর্যটন মৌসুমে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

নেপালের পর্যটন খাতের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এমন সংকট অবশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর দেশটির পর্যটন ব্যবসা বড় ধাক্কা খেয়েছিল। পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, ২০২৩ সালের বন্যা এবং ২০২৪ সালের অতিবৃষ্টি, ভূমিধস ও বন্যারও প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল পর্যটনে। গত বছর নতুন প্রজন্মের আন্দোলন ঘিরেও ব্যবসায় ক্ষতির মুখে পড়ার কথা উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বিজয়কুমার সিংহের মতে, পাহাড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল নেপালের পর্যটন খাতকে টেকসই রাখতে ঝুঁকিগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। কাঠমান্ডু পোস্টকে তিনি বলেন, “আমাদের পর্যটন কার্যত পাহাড়ের উপর নির্ভর করে। সেখানে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যা ভবিষ্যতের বিপর্যয় প্রতিরোধের জন্য সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ে দ্রুত বরফ গলে যাওয়া এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে কোশি অববাহিকার ৪২টি হিমবাহ-হ্রদকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব হ্রদের কিছু ‘ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি’ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অঞ্চলের সঙ্গে এভারেস্ট এলাকার সংযোগ থাকায় বিষয়টি পর্যটন নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এভারেস্ট অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্বত-পর্যটন গন্তব্য।

বিজয়কুমার সিংহ বলেন, “প্রাকৃতিক বিপর্যয় বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে, যে কোনও সময়ে হতে পারে। কিন্তু সেই সমস্যা মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন সব কিছু বদলে দিচ্ছে এবং নেপাল এটিকে উপেক্ষা করতে পারে না।”

দুর্গম পর্যটন ও ট্রেকিং এলাকায় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্যাটেলাইট ফোনসহ প্রয়োজনীয় যোগাযোগ সরঞ্জাম রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ অবকাঠামো, কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বিপর্যয়ের সময় পর্যটকদের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি নেপালের পর্যটন খাতের প্রতি আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের আস্থাও ধরে রাখা সম্ভব হবে।