মানুষের ভবিষ্যৎ চাঁদ ও গভীর মহাকাশ ভ্রমণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ মহাজাগতিক বিকিরণ। পৃথিবীর সুরক্ষিত বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বকক্ষেত্রের বাইরে এই অদৃশ্য বিকিরণের প্রভাব কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, তা বুঝতে ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ অভিযানে চাঁদের কক্ষপথে পাঠানো হয়েছিল পাঁচটি ছোট ইঁদুর।
অ্যাপোলো ১৭ মহাকাশযানটি ১৯৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। প্রায় ১৩ দিনের এই অভিযানের পর ১৯ ডিসেম্বর মহাকাশযানটি পৃথিবীতে ফিরে আসে। পুরো যাত্রায় ইঁদুরগুলো কমান্ড মডিউলের একটি সিলগালা পাত্রে রাখা হয়েছিল।
গবেষণার অংশ হিসেবে প্রতিটি ইঁদুরের মাথার চামড়ার নিচে ছোট প্লাস্টিকের ডসিমিটার বসানো হয়। ‘বায়োকোর’ নামের এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল জীবন্ত কোষের ভেতর দিয়ে মহাজাগতিক রশ্মি কীভাবে প্রবাহিত হয় এবং তা সূক্ষ্ম কোনো ক্ষতি সৃষ্টি করে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, ইঁদুরগুলো ছিল প্যাসিফিক পকেট মাউস প্রজাতির। ছোট আকারের এই প্রাণীগুলো কম পানি ব্যবহার করেই বেঁচে থাকতে সক্ষম হওয়ায় মহাকাশ গবেষণার জন্য এগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছিল।
পরীক্ষার ফল তুলনা করতে পৃথিবীতে একই ধরনের আরও পাঁচটি ইঁদুর পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এতে মহাকাশযাত্রার কারণে দেখা দেওয়া পরিবর্তনগুলো বিকিরণের ফল কি না, তা যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়।
পৃথিবীতে ফেরার পর পাঁচটির মধ্যে চারটি ইঁদুর জীবিত ছিল। পরে তাদের মাথার টিস্যু, চোখ, কান ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা দেখতে পান, প্রতিটি মনিটরে গড়ে ১৬টি উচ্চশক্তির কণার চিহ্ন রয়েছে। এটি ইঁদুরগুলোর মাথার ভেতর দিয়ে মহাজাগতিক কণা অতিক্রম করার প্রমাণ দেয়।
ইঁদুরগুলোর মাথায় কিছু ক্ষত পাওয়া গেলেও যন্ত্রে শনাক্ত কণার চিহ্নের সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষতের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। পরবর্তী পরীক্ষায় চারটি ইঁদুরের মাথায় আরও ১৩টি ক্ষত শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে মাত্র একটি ক্ষতের সঙ্গে যন্ত্রের শনাক্ত করা সংকেতের মিল পাওয়া যায়।
গবেষকদের মতে, শনাক্ত না হওয়া অন্য কণাও কিছু ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায়নি যে মহাজাগতিক রশ্মির কারণেই এসব ক্ষত তৈরি হয়েছিল। মহাকাশযানের পরিবেশগত অন্যান্য উপাদান, যেমন পটাশিয়াম-সুপারঅক্সাইড ব্যবস্থার চাপও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবু এই গবেষণা ভবিষ্যতের মহাকাশ ভ্রমণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বা ভবিষ্যতে মঙ্গলসহ আরও দূরবর্তী গন্তব্যে মানুষ পাঠাতে হলে মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে মহাকাশচারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। অ্যাপোলো ১৭-এর এই পরীক্ষাটি সেই চ্যালেঞ্জ বোঝার প্রাথমিক গবেষণাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।