বাংলার পল্লিজীবন, নদী, মাঠ, কৃষক ও লোকজ সংস্কৃতি জসীমউদ্দীনের সাহিত্যজুড়ে বারবার ফিরে এসেছে। সেই পল্লীকবির সাহিত্যকে আরও কাছ থেকে বুঝতে চাইলে ঘুরে দেখা যেতে পারে ফরিদপুরের তাম্বুলখানা, গোবিন্দপুর ও অম্বিকাপুর। জন্মস্থান, পৈতৃক স্মৃতি, জাদুঘর ও কুমার নদের তীর মিলিয়ে এটি হতে পারে একদিন বা দুই দিনের সাহিত্যভিত্তিক ভ্রমণ।

শুরু হোক তাম্বুলখানা থেকে

পল্লীকবি জসীমউদ্দীন ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুরের তাম্বুলখানা গ্রামে তাঁর নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাই কবির স্মৃতির পথে ভ্রমণের শুরু হতে পারে এই গ্রাম থেকেই।

ফরিদপুর শহর পেরিয়ে গ্রামীণ পথে এগোলে বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। সবুজ, পুকুর, গাছপালা ও গ্রামীণ বসতি জসীমউদ্দীনের শৈশব এবং সাহিত্যিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত পল্লিপরিবেশের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।

জন্মস্থান ঘুরে দেখার পাশাপাশি আশপাশের গ্রামীণ পরিবেশও উপভোগ করা যায়। কারণ জসীমউদ্দীনের সাহিত্য বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর বেড়ে ওঠার ভূগোলও গুরুত্বপূর্ণ।

পৈতৃক স্মৃতির গোবিন্দপুর

তাম্বুলখানা থেকে যাওয়া যায় গোবিন্দপুরে। কবির পারিবারিক শিকড় ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত এই গ্রামে গ্রামীণ পরিবেশের পাশাপাশি স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে কবির সমাধিস্থল ও পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত জায়গাগুলো ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ।

জসীমউদ্দীনের কবিতা ও গানে যে গ্রামবাংলার চিত্র উঠে এসেছে, গোবিন্দপুরে গেলে সেই পরিবেশের অনেকটাই বাস্তবে অনুভব করা সম্ভব।

কুমার নদের তীরে অম্বিকাপুর

এরপর গন্তব্য হতে পারে ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর। কুমার নদের তীরে রয়েছে পল্লীকবি জসীম উদ্দীন জাদুঘর ও লোক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। কবির জীবন, সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত স্মৃতি জানতে এটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ঘুরে দেখার পাশাপাশি কুমার নদের তীরেও কিছুটা সময় কাটানো যায়। ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কিংবা ‘কবর’-এর মতো রচনায় যে নদী, মাঠ ও গ্রামীণ জীবনের উপস্থিতি, সেই বাস্তব পরিবেশ ভ্রমণকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে।

তবে নদীর তীরে গেলে নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে বর্ষায় পানির স্রোত ও তীরের পরিস্থিতি সম্পর্কে স্থানীয়দের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

একদিনে নাকি দুই দিনে?

ঢাকা থেকে ফরিদপুর সড়কপথে যাওয়া যায়। পদ্মা সেতু চালুর পর এ পথে যোগাযোগ আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। ফরিদপুর শহরে পৌঁছে স্থানীয় অটোরিকশা, ইজিবাইক, সিএনজি বা রিকশায় বিভিন্ন স্থানে যাওয়া সম্ভব। তবে তাম্বুলখানা, গোবিন্দপুর ও অম্বিকাপুরের নির্দিষ্ট স্থান এবং স্থানীয় যাতায়াতের ব্যবস্থা আগে থেকে নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।

সময় কম থাকলে একদিনে ভ্রমণটি করা যেতে পারে। তবে তাড়াহুড়ো না করে গ্রামীণ পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে দুই দিনের পরিকল্পনা বেশি স্বস্তিদায়ক। প্রথম দিন তাম্বুলখানা ও গোবিন্দপুর এবং দ্বিতীয় দিন অম্বিকাপুর, জাদুঘর ও কুমার নদের তীর ঘুরে দেখা যেতে পারে।

শীত ও বসন্তে গ্রামীণ পথে ঘোরাঘুরি তুলনামূলক আরামদায়ক। বর্ষায় প্রকৃতি আরও সবুজ হলেও রাস্তা ও নদীর পানির পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

গ্রামীণ ভ্রমণের জন্য আরামদায়ক পোশাক ও জুতা, ছাতা বা বৃষ্টির পোশাক, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পানির বোতল ও মুঠোফোনের অতিরিক্ত চার্জের ব্যবস্থা সঙ্গে রাখা ভালো।

জসীমউদ্দীনের সাহিত্য পড়তে পড়তে যে গ্রামবাংলার ছবি কল্পনায় ভেসে ওঠে, ফরিদপুরের তাম্বুলখানা, গোবিন্দপুর ও অম্বিকাপুর সেই কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের একটি যোগ তৈরি করতে পারে। এটি শুধু একজন কবির স্মৃতিচিহ্ন দেখার ভ্রমণ নয়, বাংলার মাটি, মানুষ ও লোকজ জীবনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক অনুভবেরও একটি সুযোগ।