বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য সেন্টমার্টিন দ্বীপ এখন একসঙ্গে কয়েকটি সংকটের মুখে। বৈরী আবহাওয়ায় নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা। এর সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসক ও জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকার সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি। সব মিলিয়ে পর্যটননির্ভর এই দ্বীপে স্বাভাবিক জনজীবনও ব্যাহত হচ্ছে।
দ্বীপবাসীরা জানান, সাগর উত্তাল হলে টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্য দ্বীপে পৌঁছাতে পারে না। কয়েক দিনের মধ্যেই সংকট দেখা দেয় এবং অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যায়। তাদের দাবি, দ্বীপে সরকারি উদ্যোগে একটি খাদ্যগুদাম বা জরুরি খাদ্য মজুত ব্যবস্থা থাকলে এ সংকট মোকাবিলা সহজ হতো।
সেন্টমার্টিনের অর্থনীতির বড় অংশ পর্যটননির্ভর। স্থানীয়দের ভাষ্য, দ্বীপের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের সারা বছরের আয় পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় আয় কমেছে।
স্বাস্থ্যসেবাও বড় উদ্বেগের বিষয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর ধরে সেন্টমার্টিন হাসপাতালে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকা নেই। দ্বীপে বিপুলসংখ্যক কুকুর থাকায় কুকুরের আক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসক না থাকায় জরুরি চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল হোসাইন বলেন, তিনি বর্তমানে অসুস্থ থাকায় ছুটিতে আছেন। তবে তাঁর জানা মতে, সেন্টমার্টিনে বর্তমানে কোনো চিকিৎসক কর্মরত নেই। সেখানে চিকিৎসক দেওয়ার বিষয়ে কাজ চলছে। জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকার বিষয়ে তিনি জানান, বিষয়টি প্রাণিসম্পদ বিভাগের আওতাধীন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
বিদ্যুৎ সংকটও দীর্ঘদিনের। বর্ষায় পর্যাপ্ত সূর্যালোক না থাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। পাশাপাশি ব্লু মেরিন কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারায় অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, বড় ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে সমুদ্রের পানি দ্বীপের ভূমির উচ্চতা ছাড়িয়ে গেলে পুরো দ্বীপ প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তারা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, উপকূলীয় সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন।
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বলেন, হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকা নেই। বিদ্যুৎ সংকটও চরম। বৈরী আবহাওয়ায় নৌযোগাযোগ বন্ধ হলে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সংকট দেখা দেয়। তিনি দ্রুত টিকা সরবরাহ, বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা এবং সরকারি খাদ্যগুদাম স্থাপনের দাবি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শোয়েব বলেন, পর্যটননির্ভর মানুষের আয় কমে গেছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নেই এবং নৌযোগাযোগ বন্ধ থাকলে জরুরি প্রয়োজনে টেকনাফে যাতায়াতও সম্ভব হয় না। তাঁর দাবি, সাগরে আরাকান আর্মির তৎপরতার কারণে জেলেদের মধ্যেও মাছ ধরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপবাসী দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে রয়েছেন। সমস্যাগুলো সরকারের নজরে এনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
টেকনাফ-সেন্টমার্টিন ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদ বলেন, বৈরী আবহাওয়া বা সতর্কসংকেত জারি হলে যাত্রীবাহী ট্রলার চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। এতে যাত্রী চলাচলের পাশাপাশি খাদ্যপণ্য সরবরাহও ব্যাহত হয়।
টেকনাফের ইউএনও এস. এম. অনীক চৌধুরী বলেন, সেন্টমার্টিনে প্রতি মাসে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পাঠানো হয়। জরুরি পরিস্থিতির জন্য আলাদা খাদ্য মজুত রাখতে একটি খাদ্যগুদাম নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। নৌযোগাযোগ ব্যাহত হলে সাময়িক সমস্যা হলেও জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত খাদ্যসামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।