বেশির ভাগ মানুষই ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট দেখতে ভালোবাসেন। সম্ভবত এ কারণেই লেখাটি অনেকে পড়ছেন। একসময় সেরা ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্টের মূল ভিত্তি ছিল কৌতূহল।
ভ্রমণবিষয়ক লেখক স্যাম ফার্লে সম্প্রতি ‘ফারআউট’ সাময়িকীতে লিখেছেন, ‘আধুনিক যুগের সেরা কনটেন্ট নির্মাতাদের কথা ভাবুন—অ্যান্থনি বুরডেইন থেকে সাইমন উইলসন পর্যন্ত। তারা সাধারণত স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের মিশিয়ে দিতেন। কখনো স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন, কখনো তুলে ধরতেন বিস্মৃত ইতিহাস, আবার কখনো এমন জায়গা ও গল্প দেখাতেন, যা দর্শক আগে দেখেননি।’
কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজর কাড়ার আরেকটি সহজ ফর্মুলা তৈরি হওয়ার কথা বলেছে ফার্লে। 

ফার্লের লেখাটি বাংলার কলম্বাসের পাঠকদের জন্য নিচে তুলে ধরা হলো—
আমি একে বলছি ‘ইডিয়ট ট্যুরিস্ট গ্রিফট’, অর্থাৎ ‘বোকা পর্যটক’ সাজিয়ে কনটেন্ট বানানোর ফাঁদ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ধরনের কনটেন্ট ক্রমেই বেড়েছে। এর ফর্মুলাটা খুবই সহজ—

প্রথম ধাপ: নতুন একটি দেশে উড়ে যান।

দ্বিতীয় ধাপ: সাময়িকভাবে ভুলে যান, সভ্য সমাজ কীভাবে কাজ করে।

তৃতীয় ধাপ: এমন সব বিষয় দেখে ক্যামেরার সামনে বিস্মিত হওয়ার অভিনয় করুন, যা স্থানীয় মানুষ বহু দশক ধরে প্রতিদিনই দেখছে। এমনকি দেশটিতে কখনো না যাওয়া মানুষও যেসব বিষয় সম্পর্কে জানে।

চতুর্থ ধাপ: একই কাজ বারবার করুন এবং অ্যালগরিদমের দয়ায় জনপ্রিয় হয়ে উঠুন।
এসবই করা হয় ঠোঁটে আত্মতুষ্টির হাসি নিয়ে। যেন আপনি ডেভিড অ্যাটেনবরো হয়ে আমাজনের গভীরে অজানা কোনো উপজাতি আবিষ্কার করেছেন! অথচ বাস্তবে আপনি হয়তো শুধু একটি বাসস্টপের পাশে ম্যাকডোনাল্ডস দেখছেন।

স্থানীয় জীবন আবিষ্কারে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এটি প্রকৃত সংস্কৃতিগত বিস্ময় নয়। বরং স্থানীয় খাবার খেতে গিয়ে অতিরঞ্জিত অভিনয়, আর এমন সব প্রশ্ন করা—যার উত্তর এতটাই স্পষ্ট যে প্রশ্ন শুনেই মাথা ঘুরে যায়। 

এখানে অন্য সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা নেই, মানুষের অভিন্ন অভিজ্ঞতাকে উদ্যাপনের চেষ্টা নেই, স্থানীয় রীতিনীতির ছোট ছোট বিষয় তুলে ধরার আগ্রহও নেই। সব প্রতিক্রিয়াই তৈরি করা হয় শুধু এনগেজমেন্টের জন্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষা বা গভীর বিশ্লেষণকে সব সময় পুরস্কৃত করে না; এটি পুরস্কৃত করে আবেগকে। আর মানুষকে কোনো কিছুর ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য করার মতো কার্যকর উপায় খুব কমই আছে। ইচ্ছাকৃতভাবে দর্শকদের উসকে দেওয়া গেলে মন্তব্যের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।
এ বছর ‘বোকা পর্যটক’ কনটেন্টের এই প্রবণতা যেন চূড়ায় পৌঁছেছে, বিশেষ করে বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর। অসংখ্য ইনফ্লুয়েন্সার এমন সব ভ্রমণ কনটেন্ট তৈরি করেছেন, যেগুলো ছিল অত্যন্ত একঘেয়ে। 

ভালো ভ্রমণ কনটেন্টের কাজ হলো এমন কিছু শেখানো, যা আপনি আগে জানতেন না। অথচ এই ভিডিওগুলোতে খুব কমই ইতিহাস, প্রেক্ষাপট বা মানুষের গল্প থাকে। ফলে এগুলো হয়ে ওঠে শুধু প্রতিক্রিয়ানির্ভর, সাধারণ ও অর্থহীন কনটেন্ট।
সেরা ভ্রমণ কনটেন্ট নির্মাতাদের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব অবশ্যই থাকে। কিন্তু তাদের কনটেন্টে মূল বিষয় থাকে গন্তব্য ও সেখানকার মানুষ—নির্মাতা নিজে নন।

‘বোকা পর্যটক’ কনটেন্টের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর উদ্দেশ্য। সবকিছু আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয় গল্প বলার জন্য নয়, বরং লাইক ও মন্তব্য পাওয়ার জন্য। আর শেষ লক্ষ্য থাকে বিনামূল্যের সুবিধা পাওয়া এবং যত বেশি সম্ভব বিশেষ সুযোগ বা প্রবেশাধিকার অর্জন করা।
এ ধরনের কনটেন্ট চেনাও সহজ। এখানে গুরুতর প্রশ্ন করার বদলে নির্মাতা ইচ্ছা করে অজ্ঞ, বোকা বা অদ্ভুত আচরণ করেন। উদ্দেশ্য একটাই— এনগেজমেন্ট কুড়ানো। অনেক সময় তারা সবচেয়ে সাধারণ সামাজিক বা সাংস্কৃতিক নিয়মও বোঝে না, এমন ভান করেন।
এই ‘বোকা পর্যটক’ কনটেন্টের প্রবণতা অনেকটাই পৃষ্ঠপোষকতামূলক এবং বিরক্তিকর। এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মকেন্দ্রিকতা, যেখানে গন্তব্যটি কেবল নির্মাতার অভিনয়ের পটভূমিতে পরিণত হয়।

আর যত দিন অ্যালগরিদম বোকামিকে পুরস্কৃত করবে এবং লাইক-শেয়ার যত দিন এসব নির্মাতাকে অর্থ ও জনপ্রিয়তা এনে দেবে, তত দিন এই ‘বোকা পর্যটক’ কনটেন্টের প্রবণতা সহজে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।