ধ্বংসপ্রাপ্ত, জনশূন্য এক শহরে একা বসবাস— পৃথিবী ধ্বংসের পরের কোনো সিনেমার গল্প বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু আর্জেন্টিনার এক ব্যক্তির জন্য এটি হয়ে উঠেছিল বাস্তব জীবন।
প্রায় ২০ বছর ধরে ভিলা এপেকুয়েন যেন অস্তিত্বহীন ছিল। প্রচলিত অর্থে নয়, বরং শহরটি ডুবে ছিল গভীর পানির নিচে। পরে পানি সরে যেতে শুরু করলে এই ভূতুড়ে শহর আবার ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। আর এর সঙ্গে সামনে আসে পাবলো নোভাক নামের এক মানুষের গল্প, যিনি নিজের শহর ভিলা এপেকুয়েনে ফিরে এসে তার ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই বসবাস শুরু করেছিলেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী ফারআউট লিখেছে, এই শহরের গল্পের শুরু এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে।
১৯২১ সালে লাগো এপেকুয়েনের তীরে ভিলা এপেকুয়েন শহরটির গোড়াপত্তন হয়। হ্রদটি পুরো আর্জেন্টিনায় পরিচিত ছিল এবং এর লবণাক্ত, খনিজসমৃদ্ধ পানির কারণে একে প্রায়ই মৃত সাগরের সঙ্গে তুলনা করা হতো। এমনকি এর পানিতে সমুদ্রের পানির চেয়েও বেশি লবণাক্ততা ছিল।
এই বিশেষ পানিকে ঘিরে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক আগ্রহ। অনেকে দাবি করতেন, হ্রদের পানি বাতের পাশাপাশি ত্বকের সমস্যা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যার চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে।
প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ভিলা এপেকুয়েন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় স্বাস্থ্য ও অবকাশকেন্দ্রে পরিণত হয়। শহরের বাসিন্দা ছিল মাত্র প্রায় দেড় হাজার। কিন্তু সারা বছরই এখানে পর্যটকের ভিড় থাকত। আর গ্রীষ্মকালে এক মৌসুমেই পর্যটকের সংখ্যা পৌঁছে যেত প্রায় ২৫ হাজারে।
শহরটি তখন দ্রুত সমৃদ্ধ হচ্ছিল। হ্রদের তীরে ছিল বিলাসবহুল হোটেল, ব্যস্ত ক্যাফে। এমনকি রাজধানী বুয়েনস আয়ার্সের সঙ্গে ভিলা এপেকুয়েনের রেল যোগাযোগও ছিল। রাজধানীটি শহর থেকে ৩০০ মাইলেরও বেশি দূরে। সময়ের সঙ্গে শহরটি হয়ে ওঠে অভিজাত ও ফ্যাশনেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র। বিশেষ করে এর লবণাক্ত পানিতে ভেসে থাকার উপকারিতার জন্য এটি পরিচিতি পায়।
কিন্তু ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে পরিস্থিতি বদলে যায়। আর্জেন্টিনায় শুরু হয় প্রবল বৃষ্টিপাত। ফলে হ্রদের পানির উচ্চতা ক্রমেই বাড়তে থাকে। ভিলা এপেকুয়েনের জন্য এটি ছিল বড় বিপদ।
তবে প্রকৌশলীরা বাঁধ ও বন্যা প্রতিরোধব্যবস্থা নির্মাণ করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। শহরও নিরাপদ ছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকে পর্যটন ও আনন্দ-উৎসব।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত শহরের পানির প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যর্থ হয়। পানির আকস্মিক ঢেউ একটি বাঁধ ভেঙে দেয় এবং হু হু করে পানি ঢুকে পড়ে ভিলা এপেকুয়েনে।
পরিবারগুলো দ্রুত যতটুকু সম্ভব জিনিসপত্র নিয়ে শহর ছাড়ে। তাদের ধারণা ছিল, পানি নিয়ন্ত্রণে আসার কয়েক সপ্তাহ পরই তারা বাড়িতে ফিরে যেতে পারবে।
কিন্তু সেই সুযোগ আর কখনো আসেনি।
পানি ঢুকতেই থাকে। কয়েক মাসের মধ্যেই পুরো শহর পানির নিচে তলিয়ে যায়। একসময় পানির উচ্চতা এতটাই বেড়ে যায় যে ভিলা এপেকুয়েন প্রায় ১০ মিটার পানির নিচে চলে যায়।
পরবর্তী ২৫ বছর শহরটির স্মৃতি ধরে রাখে শুধু কিছু ছবি ও মানুষের স্মৃতি।
এরপর ২০০৯ সালে আবার প্রকৃতি তার ভূমিকা বদলে ফেলে। এবার শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী খরা। ধীরে ধীরে কমতে থাকে লাগো এপেকুয়েনের পানি।
প্রথমে পানির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে বাড়ির ছাদ। এরপর দেখা যায় চিমনি, রাস্তা এবং শেষ পর্যন্ত পুরো পুরো এলাকাগুলো।
তবে পানির নিচে দীর্ঘদিন থাকার কারণে ভিলা এপেকুয়েন আর আগের মতো ছিল না। হ্রদের অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি শহরটিকে বদলে দিয়েছিল। ধ্বংসাবশেষের ওপর জমে ছিল সাদা ও ধূসর লবণের স্তর। গাছগুলো সাদা হয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। ভবনের অনেক অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল; শুধু শক্তিশালী উপকরণ দিয়ে তৈরি অংশগুলোই কোনোভাবে টিকে ছিল।
এভাবেই লাগো এপেকুয়েনের পানি যেন শহরটিকে ধুয়ে নিয়ে তার ওপর নতুন করে লবণের আবরণ এঁকে দিয়েছিল।
তখনও ভিলা এপেকুয়েন জনশূন্য। আর ঠিক তখনই নিজের শহরে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন পাবলো নোভাক।
অন্য সবাই যখন অন্যত্র চলে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছেন, নোভাক চেয়েছিলেন নিজের পুরোনো জীবনকে ফিরে পেতে।
তিনি ফিরে আসেন। হয়ে ওঠেন একটি ভূতুড়ে শহরের একমাত্র বাসিন্দা।
তার চারপাশে ছিল খালি হোটেল, ধ্বংসপ্রাপ্ত গির্জা এবং বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই বসবাস করেন।
প্রায়ই কৌতূহলী পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলতেন নোভাক। তাদের শোনাতেন ১৯৮৫ সালের সেই বিপর্যয়ের আগে শহরটির জীবন ও আনন্দের গল্প।
তাঁর দৃঢ়তা ও টিকে থাকার গল্প শহরটির ধ্বংসাবশেষের মতোই মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। ২০১৩ সালে তাঁর জীবন ও ভিলা এপেকুয়েনের ইতিহাস নিয়ে ‘পাবলো’স ভিলা’ নামে একটি তথ্যচিত্রও নির্মিত হয়।
ভিলা এপেকুয়েন পানির নিচ থেকে উঠে আসার পর এটি দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম অসাধারণ ডার্ক ট্যুরিজম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বে অনেক পরিত্যক্ত শহর থাকলেও ভিলা এপেকুয়েন আলাদা। এখানকার লবণাক্ত পরিবেশে উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণের জীবন ফিরে আসা কঠিন। ফলে শহরটি যেন সময়ের মধ্যে আটকে আছে।
সাদা ও ধূসর লবণে ঢাকা ধ্বংসাবশেষগুলো আজ একসময়ের শহরটির একরঙা স্মৃতিসৌধের মতো দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতিও অন্য অনেক পরিত্যক্ত শহরের মতো সহজে এসব ধ্বংসাবশেষকে পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি।
এই অদ্ভুত ও ভিনগ্রহের মতো দৃশ্যই শহরটির অন্যতম আকর্ষণ। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় লবণে ঢাকা ধ্বংসাবশেষের ছবি তুলতে এখানে ছুটে আসেন ফটোগ্রাফাররা। অন্যরা আসেন শহরটির ইতিহাস এবং এর উত্থান-পতনের গল্প জানতে।
যে স্থান একসময় আরোগ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল, আজ তার নীরব ধ্বংসাবশেষে যেন এক ধরনের ধ্যানমগ্নতা ছড়িয়ে আছে।
ভিলা এপেকুয়েন ও পাবলো নোভাকের গল্প এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজনের কথা বলা কঠিন।
শহরটির গল্প ধ্বংসের। আর নোভাকের গল্প দৃঢ়তা, সংকল্প ও মানবিকতার।
এটি মনে করিয়ে দেয়, কোনো স্থাপনা নয়, মানুষই একটি স্থানকে জীবন্ত করে তোলে।