কোনো শহরকে সত্যিকার অর্থে বসবাসের উপযোগী করে তোলে কী? ঝকঝকে আকাশচুম্বী ভবন নাকি বিশ্বখ্যাত পর্যটন আকর্ষণ?
এগুলোর কোনোটিই মূল মানদণ্ড নয়। বরং গাড়ি ছাড়াই কর্মস্থলে যাওয়া, হেঁটে বাজার করা, হুইলচেয়ার নিয়ে রেলস্টেশনে চলাচল করা কিংবা শিশুর প্র্যাম নিয়ে নিরাপদে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে পারাটাই শহরের বাসযোগ্যতার বড় পরিচয়।
এই দিক থেকে জাপানের শহরগুলো বিশেষভাবে সফল। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৬ সালের গ্লোবাল লিভ্যাবিলিটি ইনডেক্সে ওসাকা সপ্তম এবং টোকিও দশম স্থানে রয়েছে। শীর্ষ দশে দুটি শহর থাকা একমাত্র এশীয় দেশ জাপান।
এই সাফল্যের পেছনে স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় সর্বোচ্চ স্কোরের পাশাপাশি শক্তিশালী অবকাঠামো রয়েছে। তবে বাসিন্দাদের মতে, আসল পার্থক্য তৈরি করে দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করার জন্য পরিকল্পিত ও সবার জন্য সহজলভ্য নগরব্যবস্থা। আর এর পেছনে রয়েছে চারটি সহজ নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা।
১. শহর গড়ে উঠুক দৈনন্দিন জীবনকে ঘিরে
জাপানের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘শোতেনগাই’। এট মূলত ছোট ছোট স্বাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সাজানো ঐতিহ্যবাহী কেনাকাটার সড়ক। এখানে মুদি দোকান, পুরনো কফিশপ, ক্লিনিক, সস্তার দোকান ও খাবারের ব্যবস্থা কাছাকাছি থাকে। ফলে প্রয়োজনীয় কাজ করতে গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয় না।
আমেরিকান প্যাট্রিক লিডন জাপানে এসে গাড়ির বদলে সাইকেল ব্যবহার শুরু করেন। ছোট বাড়ি ও ছোট ফ্রিজের কারণে ঘন ঘন বাজার করতে হলেও তাঁর কাছে সেটি বিরক্তিকর কাজ না হয়ে বরং সামাজিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
জাপানের রাস্তাগুলোতেও মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ছোট ডেলিভারি ভ্যান ও ক্ষুদ্র ট্রাক মানুষের উপযোগী সরু রাস্তায় চলাচল করে। পথচারী, সাইকেল ও যানবাহন একই জায়গা ভাগ করে নিলেও সেখানে বিশৃঙ্খলার বদলে তৈরি হয় এক ধরনের ভারসাম্য।
২. পরিবহনব্যবস্থা সবার জন্য
জাপানের গণপরিবহন ব্যবস্থা নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার জন্য বিশ্বখ্যাত। টোকিওতে ব্যক্তিগত গাড়ির লাইসেন্স না থাকলেও বাসিন্দারা সহজেই শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারেন।
২০০৬ সালের ‘ব্যারিয়ার-ফ্রি’ আইন-এর পর জাপানজুড়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য করা হয়। ২০২০ সালের মধ্যে ব্যস্ত রেলস্টেশনগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি এমনভাবে উন্নত করা হয়েছিল, যাতে সিঁড়ি ব্যবহার না করেও যাতায়াত করা যায়। হাজার হাজার স্টেশনে লিফট স্থাপন করা হয়।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য রাস্তায় ব্যবহৃত উঁচু হলুদ পথনির্দেশক টাইলও জাপানের উদ্ভাবন। ১৯৬৭ সালে প্রকৌশলী সেইইচি মিয়াকে এটি তৈরি করেছিলেন।
৩. জায়গাটির নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রাখা
আধুনিক বুলেট ট্রেন ও ব্যস্ত নগরকেন্দ্রের পাশাপাশি জাপান তার ঐতিহ্যকেও গুরুত্ব দেয়। পুরোনো কোনো ব্যবস্থা ভালোভাবে কাজ করলে শুধু নতুন প্রযুক্তি এসেছে বলে সেটি বদলে ফেলার প্রবণতা তুলনামূলক কম।
শহরের বহু এলাকায় শত শত বছরের পুরোনো গাছও সংরক্ষণ করা হয়। ওসাকার কাছে কায়াশিমা স্টেশনের ছাদ ভেদ করে বেড়ে ওঠা প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো কর্পূরগাছ এর অসাধারণ উদাহরণ।
ব্যস্ত ব্যবসায়িক এলাকাতেও তাই হঠাৎ দেখা মেলে পুরোনো কোনো ছোট মন্দিরের, কিংবা এমন কোনো রেস্তোরাঁর, যেখানে মালিক প্রায় সব নিয়মিত ক্রেতাকেই চেনেন। আধুনিক অবকাঠামোর সঙ্গে ঐতিহ্যের এই সহাবস্থান শহরকে দেয় নিজস্ব চরিত্র।
৪. যৌথ স্থানে শিষ্টাচার বজায় রাখা
শুধু অবকাঠামোই জাপানের শহরগুলোকে বাসযোগ্য করে তোলেনি। বাসিন্দাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শিষ্টাচারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রেলস্টেশনে নির্দিষ্ট স্থানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো, ট্রেনে নীরব থাকা, প্রয়োজন হলে বয়স্ক বা প্রতিবন্ধীদের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া, যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা—এসব দৈনন্দিন অভ্যাস শহরের জীবনকে শান্ত ও সুশৃঙ্খল রাখে।
ওসাকায় বসবাসকারী লিডনের মতে, এসব অভ্যাস মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে সে শুধু নিজের জন্য নয়, বরং বৃহত্তর একটি সমাজের অংশ। তাঁর ভাষায়, এটি হয়তো বিশ্বের সব সমস্যা সমাধানের কোনো জাদুকাঠি নয়, কিন্তু মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, সৌন্দর্য ও শান্তির দিকে ঝুঁকে থাকার মানসিকতা তৈরি করতে পারে।