ইন্দোনেশিয়ার মধ্য জাভার পাহাড়ের উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তো বটেই, বিশ্বের অন্যতম অদ্ভুত পরিত্যক্ত স্থাপনা। 
এর নাম গেরেজা আয়াম, যার অর্থ ‘চিকেন চার্চ’ বা ‘মুরগির গির্জা’। এখন পরিত্যক্ত একটি ভবন থেকে ভাইরাল পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। 
মুরগির মতো দেখতে এই গির্জাটি দেখতে দূর থেকে মনে হয় পাহাড়ের চূড়ায় বিশালাকার একটি মুরগি বসে আছে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, ভবনটি আদতে কখনোই মুরগির আকৃতিতে তৈরি করার কথা ছিল না।
১৯৮৮ সালে জাকার্তার ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল আলামসজাহ দাবি করেন, তিনি একটি ঐশী দর্শন পেয়েছিলেন। 

খ্রিস্টধর্মের প্রতি গভীর বিশ্বাস থাকা আলামসজাহ বলেন, ঈশ্বর তাকে একটি পাহাড়ের ওপর বসে থাকা একটি ঘুঘু দেখিয়েছিলেন এবং সেখানে একটি গির্জা নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ঈশ্বর তাকে স্থানটির কোনো ঠিকানা দেননি। ফলে বিষয়টি তিনি আপাতত ভুলে যান।
এর কয়েক বছর পর তিনি মধ্য জাভা ভ্রমণ করছিলেন। একটি পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পর হঠাৎ তার মনে হয়, জায়গাটি তিনি যেন চিনতে পারছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এটাই সেই স্থান যেখানে ঈশ্বর তাকে গির্জা নির্মাণ করতে বলেছেন।
পাহাড়টি বিশ্বের বৃহত্তম বৌদ্ধ মন্দির বোরোবুদুর থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে। বোরোবুদুর ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ এবং প্রতি বছর সেখানে প্রায় ৪০ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন। এসব সত্ত্বেও আলামসজাহ জমিটি কিনে নেন এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে নির্মাণকাজ শুরু করেন।

গভীর খ্রিস্টীয় বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও আলামসজাহ এটিকে শুধু খ্রিস্টানদের গির্জা হিসেবে দেখতে চাননি। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, ভবনটি যেন সবার উপাসনা ও আধ্যাত্মিক চর্চার স্থান হয়। মুসলিম, বৌদ্ধ ও হিন্দু—সব ধর্মের মানুষ এখানে স্বাগত জানাবে। ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও সহনশীলতার জন্য পরিচিত ইন্দোনেশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই ধারণাটি খুব একটা অস্বাভাবিক ছিল না।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি হওয়ার কথা ছিল অঞ্চলের অন্যতম অনন্য স্থাপনা। ভবনটি কয়েক তলা উঁচু হবে এবং ঘুঘুর দেহের ভেতরে থাকবে বড় বড় হলঘর। এসব হলঘরে প্রার্থনা সভা, কাউন্সেলিং এবং এমনকি পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল। অর্থাৎ, ধর্ম-বর্ণ-পরিচয় বা সমস্যার পার্থক্য না করে মানুষের আত্মিক নিরাময়ের জন্য এটি তৈরি করার কথা ছিল।

ভবনের ওপরের অংশে থাকার কথা ছিল পাখিটির মাথা, যা পর্যবেক্ষণ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দর্শনার্থীরা ঘাড়ের ভেতর দিয়ে সরু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে পাখিটির ঠোঁটের কাছে পৌঁছাতে পারতেন। সেখান থেকে চারপাশের বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত জঙ্গল ও আগ্নেয়গিরিপূর্ণ ভূদৃশ্য দেখা যেত।
কিন্তু আলামসজাহর জন্য নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। নির্মাণ ব্যয় ক্রমেই বেড়ে যায়, অনুদান কমে যায় এবং প্রকল্পটি শেষ করার মতো অর্থ আর পাওয়া যায়নি। ধীরে ধীরে গেরেজা আয়ামের নির্মাণকাজ শামুকের গতিতে এগোতে থাকে এবং সহস্রাব্দের শুরুর দিকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর প্রকৃতি নিজের মতো করে স্থাপনাটি দখল করতে শুরু করে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ঘুঘুর আকৃতির ভবনটি চারপাশের গাছপালায় ঢেকে যায়। কংক্রিটের দেয়াল বেয়ে লতাগুল্ম উঠে যেতে থাকে।

গেরেজা আয়াম ধীরে ধীরে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। কেউ বলতে শুরু করেন, ভবনটি ভূতুড়ে; কেউ আবার মনে করেন, এটি অভিশপ্ত। এসব গল্পই শেষ পর্যন্ত নগর-অনুসন্ধানীদের আকৃষ্ট করে। দুর্গম রাস্তা ও ঘন জঙ্গল পেরিয়ে তারা ভবনটির ভেতরে ঢুকতে শুরু করেন। পরিত্যক্ত করিডোর ও কক্ষের দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতির ছবি ছড়িয়ে পড়ে।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গেরেজা আয়ামকে নতুন জীবন দেয়। মুরগির মতো দেখতে অদ্ভুত এই গির্জার ছবি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। 

পর্যটকদের জন্য সামান্য প্রবেশমূল্য চালু করা হয়। সেই অর্থে ভবনটি পরিষ্কার ও সংস্কার করা সম্ভব হয় এবং পর্যবেক্ষণ মঞ্চের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ করে তোলা হয়। ভেতরের যেসব কক্ষ একসময় প্রার্থনার জন্য ব্যবহারের কথা ছিল, সেখানে এখন শিল্পকর্ম ও ভাস্কর্য রয়েছে। ভবনটির নির্মাণ ইতিহাস নিয়েও একটি প্রদর্শনী রয়েছে।

আলামসজাহ হয়তো গেরেজা আয়াম নিয়ে তাঁর প্রাথমিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তবে তাঁর সেই ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত এক ভিন্ন ধরনের সাফল্যের গল্প তৈরি করেছে। আজ গেরেজা আয়াম এমন এক পর্যটনকাহিনি, যেখানে বিশ্বাস, লোককথা, ব্যর্থতা এবং ইন্টারনেটের খ্যাতি একসঙ্গে মিশে তৈরি করেছে সত্যিই অনন্য এক আকর্ষণ। অনেক দিক থেকেই বলা যায়, শেষ পর্যন্ত এটি আলামসজাহর মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গেই মিলে গেছে।