ফিচার ডেস্ক | বাংলার কলম্বাস

বিশ্বব্যাপী আকাশপথ আজ শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, পর্যটন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। বর্তমানে পৃথিবীতে ৪৪ হাজারেরও বেশি বিমানবন্দর ও এয়ারফিল্ড রয়েছে। এর মধ্যে কয়েক হাজার বিমানবন্দর নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করে, আর বাকিগুলো ব্যবহৃত হয় সামরিক, কার্গো, চার্টার, প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিগত উড্ডয়নের কাজে।

আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO), Airports Council International (ACI) এবং OurAirports-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বিমান পরিবহন শিল্প প্রতি বছর ৯.৫ বিলিয়নেরও বেশি যাত্রী পরিবহন করে। একই সঙ্গে বছরে ৬০–৬৫ মিলিয়ন টনের বেশি কার্গো আকাশপথে পরিবহন হয়।

বিমানবন্দরের ইতিহাস

বিশ্বের প্রথম দিকের আধুনিক বিমানবন্দরগুলোর যাত্রা শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে। ১৯১৯ সালে প্রথম নিয়মিত আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমান পরিষেবা চালু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালের শিকাগো কনভেনশন এবং ১৯৪৭ সালে ICAO প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে নতুন যুগের সূচনা হয়। এরপর গত প্রায় ৮০ বছরে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার নতুন বিমানবন্দর নির্মিত হয়েছে।

কোন মহাদেশে কত বিমানবন্দর?

প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—

মহাদেশ    আনুমানিক বিমানবন্দর

উত্তর আমেরিকা    ১৮,০০০+
দক্ষিণ আমেরিকা    ৭,০০০+
ইউরোপ    ৬,০০০+
এশিয়া    ৬,৫০০+
আফ্রিকা    ৩,২০০+
ওশেনিয়া    ৩,৫০০+


বিশ্বের মোট বিমানবন্দরের প্রায় ৪০ শতাংশই উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত।

সর্বাধিক বিমানবন্দর রয়েছে যে ১০ দেশে

র‍্যাংক    দেশ    বিমানবন্দর

১    🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্র    ১৬,১১৬
২    🇧🇷 ব্রাজিল    ৫,২৯৭
৩    🇦🇺 অস্ট্রেলিয়া    ২,২৫৭
৪    🇲🇽 মেক্সিকো    ১,৫৮০
৫    🇨🇦 কানাডা    ১,৪৫৯
৬    🇫🇷 ফ্রান্স    ১,২১৮
৭    🇬🇧 যুক্তরাজ্য    ১,০৫৭
৮    🇷🇺 রাশিয়া    ৯০৫
৯    🇩🇪 জার্মানি    ৮৪০
১০    🇦🇷 আর্জেন্টিনা    ৭৬৪


যুক্তরাষ্ট্র কেন এত এগিয়ে?

যুক্তরাষ্ট্রে পৃথিবীর মোট বিমানবন্দরের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রয়েছে। দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যে হাজার হাজার ছোট আঞ্চলিক বিমানবন্দর, ব্যক্তিগত এয়ারস্ট্রিপ এবং জেনারেল এভিয়েশন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। শুধু যাত্রীবাহী নয়, কৃষি, জরুরি সেবা, ব্যবসায়িক ভ্রমণ এবং ব্যক্তিগত বিমান চলাচলের জন্যও বিপুল সংখ্যক বিমানবন্দর ব্যবহৃত হয়।

চীনের উত্থান

বর্তমানে চীনে প্রায় ৫৫০টির বেশি বিমানবন্দর ও এয়ারফিল্ড রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২৭০টি বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমানবন্দর। চীনের সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৪০০-এর বেশি বাণিজ্যিক বিমানবন্দরে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

ভারতের দ্রুত সম্প্রসারণ

ভারতে বর্তমানে ৩১৫টির বেশি বিমানবন্দর ও এয়ারফিল্ড রয়েছে। দেশটির UDAN (উড়ান) কর্মসূচির মাধ্যমে ছোট শহরগুলোকে বিমান যোগাযোগের আওতায় আনা হচ্ছে। আগামী দশকে আরও শতাধিক নতুন বিমানবন্দর চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

বছরে কত যাত্রী ভ্রমণ করেন?

বিশ্বব্যাপী ২০২৪ সালে—

✈️ মোট যাত্রী: ৯.৫ বিলিয়নের বেশি

🛫 প্রতিদিন গড় ফ্লাইট: ১,০০,০০০-এর বেশি

🌍 প্রতিদিন যাত্রী: প্রায় ২.৫–২.৭ কোটি

📦 বার্ষিক কার্গো: ৬০–৬৫ মিলিয়ন টন


বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দর

যাত্রীসংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দরগুলো হলো—

১. আটলান্টা (যুক্তরাষ্ট্র)
২. দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত)
৩. ডালাস/ফোর্ট ওয়ার্থ (যুক্তরাষ্ট্র)
৪. টোকিও হানেদা (জাপান)
৫. লন্ডন হিথ্রো (যুক্তরাজ্য)

প্রতিটি বিমানবন্দর বছরে ৬০ থেকে ১১০ মিলিয়নেরও বেশি যাত্রী পরিচালনা করে।

বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশে বর্তমানে তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কয়েকটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর এবং সামরিক ও বিশেষায়িত এয়ারফিল্ডসহ মোট প্রায় ১৮–২০টি বিমানবন্দর ও এয়ারফিল্ড রয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর, যেখানে প্রতিবছর প্রায় ১ কোটিরও বেশি যাত্রী চলাচল করেন।

অর্থনীতিতে বিমানবন্দরের অবদান

বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের একটি বড় অংশই বিমান পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, বিমান পরিবহন শিল্প বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সমর্থন করে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।

বিশ্বের বিমানবন্দরের হিট ম্যাপ শুধু আকাশপথের ঘনত্বই দেখায় না; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, পর্যটন, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং উন্নয়নের একটি শক্তিশালী সূচকও। যে দেশগুলোর বিমানবন্দর নেটওয়ার্ক যত বিস্তৃত, সাধারণভাবে তাদের আন্তর্জাতিক সংযোগ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতাও তত বেশি। আগামী দশকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার নতুন বিমানবন্দর প্রকল্পগুলো বৈশ্বিক বিমান পরিবহনের মানচিত্রে আরও বড় পরিবর্তন আনবে।