রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক শুধু মেঘ আর পাহাড়ের জন্যই নয়, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সংস্কৃতি জানার ক্ষেত্রেও অনন্য এক গন্তব্য। সাজেকের শেষ প্রান্তে পাহাড়ঘেরা পরিবেশে গড়ে ওঠা লুসাই সাংস্কৃতিক পার্ক পর্যটকদের সামনে তুলে ধরছে লুসাই জনগোষ্ঠীর শতবর্ষের ঐতিহ্য, জীবনধারা ও সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ।
সাজেকের রুইলুই পাড়া অতিক্রম করলেই দেখা মেলে লুসাই সাংস্কৃতিক পার্কের। মাত্র ৩০ টাকার প্রবেশমূল্যে দর্শনার্থীরা জানতে পারেন লুসাই সম্প্রদায়ের বসবাসের ধরন, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, ব্যবহৃত সামগ্রী, বাদ্যযন্ত্র এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের নানা দিক।
ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, লুসাই জনগোষ্ঠী প্রায় দেড় থেকে দুই শতাব্দী আগে ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমারের চিন রাজ্য থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে। ব্রিটিশ আমলে সাজেকসংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল। সময়ের সঙ্গে উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক সুবিধার খোঁজে অনেক লুসাই পরিবার মিজোরামে ফিরে গেলেও সাজেকে এখনো কিছু পরিবার বসবাস করছে। তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরতেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
পার্কে প্রবেশ করলেই যেন একটি ঐতিহ্যবাহী লুসাই গ্রামে পৌঁছে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। এখানে রয়েছে লুসাইদের ঐতিহ্যবাহী মাচাং ঘর এবং জলবুক বা যুদ্ধঘরের প্রতিরূপ। পাশাপাশি প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে শিকারের প্রাচীন সরঞ্জাম, জুমচাষে ব্যবহৃত উপকরণ এবং ঐতিহ্যবাহী রান্নার সামগ্রী। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও চারপাশের পাহাড়ি সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
লুসাই সমাজ উৎসব, গান ও নৃত্যপ্রিয় হিসেবে পরিচিত। তাদের অন্যতম প্রধান উৎসব চাপচারকূত, যা সাধারণত বসন্তকালে মার্চ মাসে উদযাপিত হয়। এই জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী চেরাও নৃত্য, যা বাঁশ নাচ নামেও পরিচিত, পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয়। পার্কে ১০০ টাকার বিনিময়ে লুসাইদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ছবি তোলার সুযোগও রয়েছে।
তবে লুসাই সাংস্কৃতিক পার্কের আকর্ষণ শুধু ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। সাজেকের পাহাড়ি পরিবেশে রাতযাপন, ভোরের মেঘের সমুদ্র এবং প্রকৃতির নৈঃশব্দ্য ভ্রমণকে করে তোলে আরও স্মরণীয়। কটেজের বারান্দা থেকে মেঘে ঢাকা পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতা অনেক পর্যটকের কাছে সাজেক ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
যেভাবে যাবেন
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে চাঁদের গাড়ি কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সাজেক পৌঁছানো যায়। রুইলুই পাড়া অতিক্রম করার পরই দেখা মিলবে লুসাই সাংস্কৃতিক পার্কের।
ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টিকে সাজেক ও লুসাই গ্রাম ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ধরা হয়। বর্ষার পর পাহাড়ে সবুজের সমারোহ যেমন থাকে, তেমনি মেঘও দেখা যায় খুব কাছ থেকে। আর লুসাই সংস্কৃতির উৎসবমুখর পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে বসন্তের শুরুতে ভ্রমণ করা যেতে পারে।