শীতের দুটো মাস যেন সেন্টমার্টিনের জন্য ছিল এক ভিন্ন জীবনচক্র। নীল সমুদ্রের বুক চিরে জাহাজ এসে ভিড়েছে ঘাটে, সৈকতে ভিড় জমিয়েছে পর্যটক, ক্যামেরার ক্লিকে বন্দি হয়েছে সূর্যাস্ত আর প্রবালের রঙিন জগৎ। তবে নির্ধারিত সময় শেষ হতেই আবার বদলে গেছে দৃশ্যপট। পর্যটন মৌসুম শেষ হওয়ার পর দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন এখন ধীরে ধীরে ফিরছে তার চিরচেনা নীরবতায়।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসজুড়ে দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর ছিল দ্বীপটি। পরিবার নিয়ে কেউ এসেছেন অবকাশ যাপনে, কেউ বা শহরের যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছুদিনের মুক্তির খোঁজে। নীল জলরাশি, স্বচ্ছ পানিতে দৃশ্যমান প্রবাল, সামুদ্রিক মাছের আনাগোনা আর নির্জন সৈকতের শান্ত পরিবেশ সেন্টমার্টিনকে পরিণত করেছিল প্রকৃতিপ্রেমীদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক হুমায়ুন কবির বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। নীল সমুদ্র আর খোলা আকাশের নিচে সময় কাটানো সত্যিই উপভোগ্য ছিল।
চট্টগ্রাম থেকে আসা শিরিন আক্তারের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তাঁর ভাষায়, প্রকৃতির এত কাছাকাছি থাকার সুযোগ খুব কম জায়গায় পাওয়া যায়। সমুদ্রের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখা আর ঢেউয়ের শব্দ শোনা ভোলার মতো নয়।
অনেক পর্যটকের কাছে যাত্রাপথটিও ছিল সমান আকর্ষণীয়। কক্সবাজার হয়ে জাহাজে সেন্টমার্টিনে যাওয়া তৌফিক রহমান বলেন, চারদিকে শুধু সমুদ্র আর আকাশ। নীল জলরাশির মাঝে ভেসে যাওয়ার অনুভূতিটাই আলাদা। দ্বীপে পৌঁছে সেই অভিজ্ঞতা আরও গভীর হয়।
পর্যটকরা জানান, বিকেলের সূর্যাস্ত ছিল ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। ডুবে যাওয়া সূর্যের লাল-কমলা আভা যখন সমুদ্রের জলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে মায়াবী। পাশাপাশি স্বচ্ছ পানিতে ছোট মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর চলাচল দেখাও ছিল আনন্দদায়ক। সৈকতে হাঁটা, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া আর ছবি তোলার মধ্য দিয়ে স্মরণীয় সময় কাটিয়েছেন তারা।
এই সময় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্রিয় ছিল প্রশাসন। টুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত ডিআইজি) মো. আপেল মাহমুদ জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ সদস্য মোতায়েন, নিয়মিত টহল এবং জাহাজঘাট ও পর্যটন এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের আগমনে দ্বীপে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছিল এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উপকৃত হয়েছেন। তবে একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম জানান, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দুই মাস পর্যটন কার্যক্রম চালু ছিল। সেন্টমার্টিন পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা হওয়ায় পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দিকে প্রশাসনের নজর ছিল।