পাহাড়জুড়ে আবারও বাজছে বর্ষবরণের ডাক। রাঙামাটির পাহাড়ি জনপদে শুরু হয়েছে বৈসাবি উৎসবের প্রস্তুতি, যেখানে ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও আনন্দ মিশে এক অনন্য সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এই উৎসব শুধু নববর্ষ উদযাপন নয়, বরং তাদের জীবনধারা ও বিশ্বাসের গভীর প্রতিফলন।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রায় অর্ধমাস ধরে চলে বৈসাবি। এ সময় পাহাড়ি পাড়া-মহল্লায় গানের সুর, নাচের ছন্দ আর উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, লুসাই, পাঙ্খোয়া ও খিয়াংসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিজস্ব রীতিতে বর্ষবরণ করে, যা সম্মিলিতভাবে বৈসাবি নামে পরিচিত।
চাকমাদের কাছে এটি ‘বিজু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’, ত্রিপুরাদের ‘বৈসুক’, লুসাই ও খিয়াংদের ‘বিষু’। নাম ভিন্ন হলেও মূল সুর এক। পুরোনো বছরের বিদায় ও নতুন বছরের আগমনকে কেন্দ্র করে চলে নানা আচার-অনুষ্ঠান।
বিজু উৎসব তিন দিনে বিভক্ত। প্রথম দিন ফুলবিজু। এদিন ঘরদোর পরিষ্কার করে জঙ্গল থেকে আনা ফুল দিয়ে সাজানো হয়। গৃহপালিত প্রাণী ও কৃষিকাজের উপকরণও ফুল দিয়ে অলংকৃত করা হয়। এটি পুরোনোকে বিদায় জানানোর প্রতীক।
দ্বিতীয় দিন মূলবিজু, যা আনন্দের শিখর। ভোরে নদীর পাড়ে গিয়ে তরুণ-তরুণীরা কলাপাতায় ফুল ভাসিয়ে নতুন বছরের মঙ্গল কামনা করে। পরে ছোটরা বেতের পাত্রে ধান-কুঁড়া নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাঁস-মুরগিকে খাওয়ায়। মুরুব্বিদের সম্মান জানানো এবং তাদের আগে খাবার পরিবেশন করা বাধ্যতামূলক।
এদিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ‘উদিজগর্বা’ বা অতিথি আপ্যায়ন। যে কেউ হঠাৎ অতিথি হয়ে এলে তাকে সাদরে গ্রহণ করা হয়। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চলে খাওয়া-দাওয়া। ঐতিহ্যবাহী ‘পাঁজন’ এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ, যা বহু ধরনের সবজি দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। পাশাপাশি থাকে মাংস, পিঠা, মিষ্টান্নসহ নানা পদ।
তৃতীয় দিন গোজ্যেপোজ্যে। টানা উৎসবের পর এদিন বিশ্রামের পালা।
পাহাড়ের এই উৎসবে বয়স, পেশা বা সামাজিক অবস্থানের ভেদাভেদ থাকে না। সবাই একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও অটুট রয়েছে।
ভ্রমণ ও সতর্কতা
বৈসাবি দেখতে গেলে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। আগে থেকেই থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ভালো। ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি রাঙামাটি যাওয়া যায়। শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে।