দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নর্ত নদের তীরে নীরব সবুজে মোড়া সিংড়া বন যেন এক অচেনা শান্তির ঠিকানা। ছোট আয়তনের এই শালবন শহুরে কোলাহল থেকে দূরে এনে দেয় নির্মল প্রকৃতির স্পর্শ, যেখানে পাখির কলতান আর শুকনো পাতার মর্মর শব্দই প্রধান সঙ্গী।
বীরগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে ভোগনগর ইউনিয়ন। বড় সড়কের পাশে বটতলা বাজার থেকে দক্ষিণে সরু পথ ধরে এগোলে দূর থেকেই চোখে পড়ে সবুজের রেখা। কাছে গেলে স্পষ্ট হয় শালবনের বিস্তার। নিস্তব্ধ পরিবেশে কোকিল, বউ কথা কও আর ঝিঁঝিপোকার সম্মিলিত সুর প্রকৃতিকে করে তোলে জীবন্ত।
বনের প্রবেশমুখে রয়েছে একটি গেট, স্থানীয়দের ভাষায় সিংহ দরজা। তা পেরিয়ে দেখা মেলে ছোট একটি গেস্টহাউস এবং তার পরেই নর্ত নদ। শুষ্ক মৌসুমে সরু এই নদী বর্ষার অপেক্ষায় থাকে, তবু তার দুই তীর জুড়ে সবুজের আভা চোখে পড়ে। নদী পার হলেই শুরু হয় সিংড়া বন, যেখানে পাতাঝরা শালগাছের সারি পথজুড়ে ছায়া ফেলে।
৩৫৫ হেক্টর আয়তনের এই বনের মধ্যে প্রায় ৩০৫ দশমিক ৬৯ হেক্টর সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যান। শালগাছ ছাড়াও এখানে রয়েছে জারুল, শিরীষ, শিমুল, সেগুন, গামারি, আকাশমণি, সোনালু, হরীতকী, বহেড়া ও আমলকীর মতো বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ। বনের ভেতর দিয়ে সরু পথ চলে গেছে আশপাশের গ্রামগুলোতে।
এই বনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি। বনপথে হাঁটতে গেলে দেখা যায়, তারা শুকনো শালপাতা সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন। এসব পাতা তাদের রান্নার প্রধান জ্বালানি। বনের সঙ্গে তাদের জীবনের এই সম্পর্ক প্রাচীন ও বাস্তব।
সিংড়া বনের আরেক আকর্ষণ গিলা লতা। অজগরের মতো মোটা এই লতা গাছ বেয়ে ওপরে উঠে এক গাছ থেকে আরেক গাছে ছড়িয়ে পড়েছে। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও এই লতা দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়ায়।
বনের ভেতরে ছোট ছোট সাঁওতাল গ্রামও রয়েছে। এসব গ্রামে মানুষের চলাফেরা থাকলেও চারপাশে বিরাজ করে এক ধরনের নীরবতা। কেবল পাখির ডাক সেই নীরবতাকে ভেঙে দেয়।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সিংড়া বন হতে পারে এক অনন্য গন্তব্য। স্বল্প আয়তনের হলেও এই বন তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও নির্জনতার জন্য আলাদা করে নজর কাড়ে। শহরের ব্যস্ততা থেকে সাময়িক মুক্তি খুঁজতে চাইলে নর্ত নদের তীরে এই বন এক স্বস্তির ঠিকানা হয়ে উঠতে পারে।