উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী জেলা নওগাঁ যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত ক্যানভাস। প্রাচীন বৌদ্ধবিহার, সুলতানি আমলের মসজিদ, জমিদারবাড়ি ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা মিলিয়ে জেলার প্রতিটি কোণেই ছড়িয়ে আছে অতীতের গল্প। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য স্বীকৃত পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার থেকে শুরু করে কুসুম্বা মসজিদ, পতিসর কাচারি বাড়ি কিংবা আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যান—নওগাঁ তাই ইতিহাস ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের জায়গা।

ঈদের ছুটিতে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে আসার জন্য এই জেলা হতে পারে একটি আদর্শ গন্তব্য। কয়েকশ বছরের পুরোনো স্থাপত্যের পাশাপাশি বিস্তীর্ণ দিঘি, বিল ও জলাভূমি পর্যটকদের দেয় ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা।

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত সোমপুর মহাবিহার, যা সাধারণভাবে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নামে পরিচিত। পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল অষ্টম বা নবম শতকে এটি নির্মাণ করেন বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।

১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম এর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন। পরে ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আয়তনের দিক থেকে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধবিহার।

প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এখানে বৌদ্ধ ধর্মচর্চা ও শিক্ষার কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। চীন, তিব্বত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভিক্ষু ও শিক্ষার্থীরা এখানে আসতেন। দশম শতকে বিখ্যাত আচার্য অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানও এই বিহারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বর্তমানে এখানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের জাদুঘর, রেস্ট হাউস ও প্রশাসনিক ভবন রয়েছে। মূল মন্দিরের চারপাশে ছোট ছোট ইটের দেয়াল, টেরাকোটার নকশা ও বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ দর্শনার্থী এখানে ভ্রমণ করেন।

কুসুম্বা মসজিদ

সুলতানি আমলের স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন কুসুম্বা মসজিদ নওগাঁর মান্দা উপজেলায় অবস্থিত। ১৫৫৮ সালে আফগান শাসক গিয়াস উদ্দীন বাহাদুর শাহের আমলে এটি নির্মিত হয় বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়।

কালো পাথরে নির্মিত এই মসজিদটি ইন্দো-আরাবিক স্থাপত্যশৈলীর চমৎকার উদাহরণ। মসজিদের দেয়ালজুড়ে টেরাকোটার সূক্ষ্ম নকশা, লতাপাতা ও ফুলের অলংকরণ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৫৮ ফুট লম্বা এবং ৫২ ফুট চওড়া এই স্থাপনাটির ছাদে রয়েছে ছয়টি গম্বুজ।

বাংলাদেশের পাঁচ টাকার নোটে এই মসজিদের ছবি ব্যবহৃত হওয়ায় এটি দেশের অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবেও পরিচিত।

পতিসর রবীন্দ্র কাছারি বাড়ি

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পতিসর গ্রামে অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাচারি বাড়ি সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের জায়গা। ঠাকুর পরিবারের কালিগ্রাম জমিদারির অংশ ছিল এই অঞ্চল।

১৮৯১ সালে রবীন্দ্রনাথ প্রথম এখানে আসেন এবং ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত নিয়মিত এই কুঠি বাড়িতে সময় কাটান। এখানকার গ্রামীণ জীবন ও মানুষের জীবনযাপন তার বহু সাহিত্যকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে।

বর্তমানে কাচারি বাড়িটিতে একটি জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে কবিগুরুর ব্যবহৃত আসবাবপত্র, চিঠিপত্র ও নানা স্মারক সংরক্ষিত আছে। প্রাঙ্গণে রয়েছে রবীন্দ্র ভাস্কর্য ও রবীন্দ্র সরোবর। প্রতি বছর ২৫ বৈশাখে এখানে বড় পরিসরে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উদ্‌যাপন করা হয়।

আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যান

নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যান। প্রায় ৫৫ একর আয়তনের এই দিঘিকে ঘিরে ২০১১ সালে ৬৫২ একর এলাকা জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়।

দিঘির চারপাশে ঘন বনভূমি, পাখির কলরব এবং উঁচু ওয়াচ টাওয়ার থেকে প্রকৃতির বিস্তৃত দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। ঈদসহ বিভিন্ন ছুটির সময় এখানে হাজারো দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

দিবর দিঘি

পত্নীতলা উপজেলায় প্রায় ২০ একর জমির ওপর অবস্থিত ঐতিহাসিক দিবর দিঘি পাল যুগের স্মৃতি বহন করে। দিঘির মাঝখানে স্থাপিত গ্রানাইট পাথরের ‘দিব্যক জয়স্তম্ভ’ এই স্থানের প্রধান আকর্ষণ।

প্রায় ৩১ ফুট উচ্চতার এই স্তম্ভের একটি অংশ পানির নিচে এবং বাকি অংশ ওপরে দৃশ্যমান। বহু শতাব্দী ধরে এটি বাঙালি ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

পর্যটকদের নিরাপত্তা

পাহাড়পুর জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান ফজলুল করিম আরজু জানান, প্রতি বছর ঈদের সময় পাহাড়পুরে দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় হয়। এ বছরও দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে সৌন্দর্যবর্ধনসহ বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে টুরিস্ট পুলিশ ও নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা বা সমস্যার ক্ষেত্রে কুইক রেসপন্স টিম দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।