ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে একটু খোলা আকাশের নিচে সময় কাটাতে চান অনেকেই। কুড়িগ্রামে এমন ভ্রমণপ্রেমীদের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠেছে ধরলা নদীর তীর। শহর থেকে খুব কাছেই হওয়ায় প্রতিদিন বিকেল নামলেই এখানে জমে ওঠে মানুষের ভিড়। নদীর শান্ত স্রোত, খোলা বাতাস আর সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ঈদের আনন্দকে বাড়িয়ে দেয় আরও কয়েক গুণ।

কুড়িগ্রাম শহর থেকে মাত্র দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ধরলা নদীর ওপর নির্মিত ধরলা সেতু এখন জেলার একটি পরিচিত ভ্রমণস্থল। সেতু ও নদীপাড় ঘিরে বিকেলের দিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ ঘুরতে আসেন।

এই সেতু কুড়িগ্রাম শহরের সঙ্গে নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার যোগাযোগ সহজ করেছে। পাশাপাশি এটি পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

৯৫০ মিটার দীর্ঘ ও প্রায় ৯ দশমিক ৮০ মিটার চওড়া এই সেতুতে রয়েছে ১৯টি স্প্যান এবং ৯৫টি গার্ডার। প্রায় ২০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি ২০১৮ সালে উদ্বোধন করা হয়। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে এটি স্থানীয়দের বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

নদীর পাড়ের বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা, দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সবুজ আর নদীর শান্ত স্রোত মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে এক স্বস্তিদায়ক পরিবেশ। বিকেল গড়ালে সেতু ও নদীর তীরে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। অনেকে সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করেন, আবার কেউ পরিবার নিয়ে নদীর পাড়ে হাঁটাহাঁটি করেন।

কেউ নৌকাভ্রমণে মেতে ওঠেন, আবার কেউ নদীর বাতাসে বসে সময় কাটান। এসব কারণে ঈদের সময় এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

এদিকে ঈদ সামনে রেখে নদীর পাড়জুড়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। ছোট ছোট দোকান, ফুচকা ও চটপটির স্টল এবং শিশুদের খেলনার দোকান সাজানো হচ্ছে।

ধরলা ফুচকা হাউজ অ্যান্ড চটপটির দোকানের মালিক শহিদুল ইসলাম জানান, ধরলা পাড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি দোকান রয়েছে। ঈদের সময় প্রতিদিন পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ঈদের সময়ই ব্যবসা সবচেয়ে ভালো হয় বলে জানান তিনি।

শুধু ধরলা পাড়ই নয়, কুড়িগ্রামে ঘুরে দেখার মতো আরও কয়েকটি স্থান রয়েছে। কুড়িগ্রাম শহরের বিজিবি পার্ক, ইকো পার্ক এবং উলিপুর উপজেলার জিয়া পুকুর এলাকাতেও দর্শনার্থীরা ভিড় করেন।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীর পাড়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যানজট এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হবে।

কুড়িগ্রাম সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের পাশাপাশি ডিএসবি সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।

স্থানীয়দের মতে, ঈদের দিনে পরিবার নিয়ে প্রকৃতির মাঝে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য ধরলা পাড় একটি উপযুক্ত স্থান। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের শিক্ষার্থী রাহদ হোসেন জানায়, প্রায় প্রতি ঈদেই বাবা-মায়ের সঙ্গে ধরলা পাড়ে ঘুরতে যায় সে। সেখানে নানা ধরনের দোকান, খেলনা আর ফুচকা খেতে খুব ভালো লাগে।

একই এলাকার বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম বলেন, ঈদের সময় শিশুদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জায়গা কম। তাই পরিবারের সবাইকে নিয়ে ধরলা পাড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি।

পৌর শহরের থানা পাড়া এলাকার শিক্ষার্থী জুই আক্তার জানায়, বাবা ঈদের আগে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরলে নতুন জামা পরে ঈদের দিন ধরলা পাড়ে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে রয়েছে তার।

ফুলবাড়ি উপজেলার ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের কলেজ শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম বলেন, ছোট ভাইদের নিয়ে ঈদের সময় ঘুরতে যাওয়ার জন্য ধরলা পাড়ই তাদের প্রধান পছন্দ।

এদিকে ধরলা পাড় এলাকার নৌকা মাঝি আয়নাল হক বলেন, সারা মাসের তুলনায় ঈদের সময় নৌকায় ঘুরতে আসা মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। এতে তাদের আয়ও ভালো হয়।

স্থানীয়দের আশা, প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ, নদীর বাতাস আর সেতু থেকে দেখা সূর্যাস্তের সৌন্দর্য মিলিয়ে ঈদের ছুটিতে ধরলা পাড় আবারও দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠবে।