ঈদের ছুটি মানেই অনেকের কাছে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা। সেই সুযোগকে সামনে রেখে উপকূলীয় জেলা বরগুনা প্রস্তুত করেছে প্রকৃতি ঘেরা একাধিক দর্শনীয় স্থান। সাগর, নদীর মোহনা, ম্যানগ্রোভ বন, নির্জন চর, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির বৈচিত্র্য মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে ভিন্ন স্বাদের পর্যটন অভিজ্ঞতা।

স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও ভ্রমণ সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় নজরদারি ও প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। ফলে ছুটির সময় বরগুনার বিভিন্ন স্পটে দর্শনার্থীর ভিড় বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

দক্ষিণের এই উপকূলীয় জেলায় তালতলী, পাথরঘাটা ও সদর উপজেলায় ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় ডজনখানেক আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান। এর মধ্যে রয়েছে শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত, নিদ্রার চর, টেংরাগিরি বনাঞ্চল, হরিণঘাটা ইকোপার্ক, রুহিতা সৈকত, বিহঙ্গ দীপ এবং সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম অ্যান্ড রিসোর্ট।

শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত

তালতলী উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নিশানবাড়িয়ার নলবুনিয়া এলাকায় অবস্থিত শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা এই সৈকতের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার।

ঝাউবন আর সমুদ্রের ঢেউয়ের মিলিত দৃশ্য এখানে ভ্রমণকারীদের প্রধান আকর্ষণ। বিকেলের সূর্যাস্ত এই সৈকতের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর মুহূর্ত।

তালতলী শহর থেকে মোটরসাইকেল বা ছোট গাড়িতে জনপ্রতি প্রায় ৬০ থেকে ৮০ টাকায় এখানে পৌঁছানো যায়। সৈকত সংলগ্ন ‘সাম্পান’ নামের একটি ছোট রেস্ট হাউজে দুই কক্ষের বুকিং প্রায় ৩ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। স্থানীয় দোকানেই খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব।

আশার চর শুঁটকিপল্লী

শুভসন্ধ্যা সৈকতের কাছেই আশার চর এলাকায় রয়েছে শুঁটকিপল্লী। এখানে বহু জেলে পরিবারের বসবাস।

এই এলাকায় গেলে পর্যটকরা রাখাইন সম্প্রদায়ের জীবনযাপন, ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ মন্দির, বুদ্ধমূর্তি এবং তাঁতশিল্প কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনধারা জানার জন্য জায়গাটি বেশ আকর্ষণীয়।

নিদ্রার চর

নিদ্রার চর বা নিদ্রা সৈকত বরগুনার তুলনামূলক নির্জন ও শান্ত একটি পর্যটন এলাকা। একদিকে বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে নদীর মোহনা। মাঝখানে কেওড়া ও ঝাউবনের বিস্তৃত সবুজ।

জোয়ার-ভাটার খেলা আর ঘাসে ঢাকা প্রান্তর এই স্থানটিকে স্বপ্নময় পরিবেশ দিয়েছে। তালতলী উপজেলা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই চরে সহজেই পৌঁছানো যায়। আশার চর থেকে স্থানীয় নৌযানে ২০ থেকে ৩০ টাকায় যাতায়াত করা সম্ভব।

টেংরাগিরি বনাঞ্চল

তালতলীর ফকিরহাট এলাকায় অবস্থিত টেংরাগিরি বনাঞ্চল এক সময় সুন্দরবনের অংশ ছিল। বর্তমানে এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত।

২০১০ সালে প্রায় ৪ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা নিয়ে এখানে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। বনাঞ্চলে হরিণ, শূকর, অজগর, কুমির, বানর এবং শজারুসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে।

পর্যটকরা ১১ টাকা ৫০ পয়সা টিকিট কেটে সকাল থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বনাঞ্চল ঘুরে দেখতে পারেন। তবে আশপাশে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা সীমিত।

হরিণঘাটা ইকোপার্ক

পাথরঘাটা উপজেলায় পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় গড়ে উঠেছে হরিণঘাটা ইকোপার্ক। এখানে প্রায় ৯৫০ মিটার দীর্ঘ ফুটট্রেইল রয়েছে, যেখানে হেঁটে বনভূমির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

ওয়াচ টাওয়ার থেকে আশপাশের বন ও নদী দেখা যায়। পাশাপাশি রয়েছে নৌকাভ্রমণের সুযোগ। এখানে হরিণ, বানর ও বুনো শূকরের উপস্থিতি পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ।

সরকারি বনবীথি রেস্ট হাউজে নন-এসি কক্ষ ১ হাজার টাকা এবং এসি কক্ষ প্রায় ২ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। প্রবেশের জন্য ১১ টাকা ৫০ পয়সা টিকিট প্রয়োজন।

রুহিতা সৈকত ও বিহঙ্গ দীপ

পাথরঘাটা উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে রুহিতা সৈকত। গাছপালায় ঘেরা শান্ত পরিবেশ, পাখির কলরব এবং সমুদ্রের বাতাস এই সৈকতকে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

এখানে পর্যটকদের বসার জন্য দোলনা ও বসার চেয়ার রয়েছে। শহর থেকে মোটরসাইকেলে জনপ্রতি প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় এখানে পৌঁছানো যায়।

এই সৈকতের কাছেই নদীর মাঝে জেগে ওঠা বিহঙ্গ দীপ অন্যতম আকর্ষণ। ১০ থেকে ১২ জন মিলে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ভাড়া করে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় সেখানে ঘুরে আসা যায়।

সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম অ্যান্ড রিসোর্ট

বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের বড়ইতলা এলাকায় অবস্থিত সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম অ্যান্ড রিসোর্ট। এটি জেলার প্রথম বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা ইকো পর্যটন কেন্দ্রগুলোর একটি।

বরগুনা পৌরশহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই স্থানে ম্যানগ্রোভ বনভূমি, খোলা জলমোহনা এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়। পর্যটকদের জন্য হাঁটার পথ, শিশুদের দোলনা এবং ছবি তোলার জন্য বিশেষ ফ্রেম রাখা হয়েছে।

প্রবেশের জন্য ১০০ টাকার টিকিট প্রয়োজন। রিসোর্টে প্রায় ৪ হাজার টাকায় কক্ষ বুকিং করে রাত্রিযাপনের সুযোগও রয়েছে। এছাড়া এখানে পিকনিক স্পট, অনুষ্ঠান মঞ্চ ও কনফারেন্স রুম রয়েছে।

নিরাপত্তা জোরদার

বরগুনা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ জানিয়েছেন, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ে। তাই পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পর্যটন এলাকায় নিয়মিত টহল থাকবে। পাশাপাশি বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।