ঢাকার অদূরে গাজীপুরের শ্রীপুরের কালমেঘা গ্রাম। চারদিকে বনভূমি, নীরবতা আর পাখির ডাক। সেই প্রকৃতির মাঝেই গড়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ আয়তনের এক আধুনিক অবকাশকেন্দ্র, যেখানে গ্রামবাংলার আবহের সঙ্গে মিলেছে আরাম ও ব্যক্তিগত গোপনতার আয়োজন। শহরের কোলাহল থেকে অল্প সময়ের পথ পেরিয়েই এখানে পাওয়া যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশ।

প্রবেশেই গ্রামবাংলার স্বাগত

প্রধান ফটকে ঢুকতেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানো হয় ঢোল ও বাঁশির সুরে। ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন যেন মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সংস্কৃতির কথা। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির কোলে পৌঁছানোর অনুভূতিটাই এখানে প্রথম আকর্ষণ।

বনভূমির ভেতর বিস্তৃত অবকাশের পরিসর

প্রায় ১৭ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই অবকাশকেন্দ্রে রয়েছে একই নকশার প্রায় ২০টি আলাদা আবাস ইউনিট, যেগুলো পাঁচটি ভিন্ন মান ও আকারে নির্মিত। প্রতিটি আবাসই প্রশস্ত, নিরিবিলি এবং পরিবার বা দলগত অবস্থানের উপযোগী।

তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের এসব আবাসে রয়েছে ব্যক্তিগত সুইমিং পুল, উষ্ণ জলের স্নানব্যবস্থা এবং খোলা বারান্দা। প্রকৃতির দিকে মুখ করে বসে সময় কাটানোর জন্য আলাদা অবকাশ তৈরি করা হয়েছে।

একটি ডুপ্লেক্স আবাসে প্রবেশ করতেই দেখা যায় প্রশস্ত বসার ঘর, পরিপাটি আসবাব এবং বনভূমির দিকে খোলা বারান্দা। ওপরতলায় রয়েছে একাধিক শয়নকক্ষ, যা বড় পরিবার বা বন্ধুদের দল নিয়ে থাকার জন্য উপযোগী।

বিশেষ স্থাপনায় ভিন্ন অভিজ্ঞতা

অবকাশকেন্দ্রের ভেতরে নির্মাণাধীন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ভবনের আদলে তৈরি একটি সাদা প্রাসাদসদৃশ স্থাপনা। মূলত গন্তব্যভিত্তিক বিয়ের আয়োজনের জন্য এটি প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বিশ্রামের পাশাপাশি নানা আয়োজন

এখানে সময় কাটানো মানেই শুধু নির্জনে থাকা নয়। রয়েছে খোলা মাঠের নানা খেলাধুলা, দলগত ক্রীড়া, ঘোড়ায় চড়া, সাইকেল ভ্রমণ, নৌবিহার, ছোট দণ্ডচালিত নৌকা চালানো, বনপথে হাঁটা, মাছ ধরা ও তীরন্দাজির মতো আয়োজন।

শিশুদের জন্য আলাদা খেলাধুলার স্থান রয়েছে। বড়দের জন্য রয়েছে টেবিলভিত্তিক খেলাও। বিকেলে লেকে নৌবিহার কিংবা সূর্যাস্তের সময় প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার সুযোগ দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।

রমজানকেন্দ্রিক বিশেষ ব্যবস্থা

রমজান উপলক্ষে এখানে চালু করা হয়েছে বিশেষ সুবিধা। ইফতার, রাতের খাবার ও সেহরিসহ নানা পদের খাবারের আয়োজন রাখা হয়েছে।

অবকাশকেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ তারেক জানান, নির্দিষ্ট মূল্যে ইফতারের খাবার গ্রহণ করলে অতিথিরা রাতযাপনের জন্য আবাস, ব্যক্তিগত সুইমিং পুল এবং অন্যান্য সব সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন। খাবারসহ পূর্ণাঙ্গ অবস্থানের ব্যবস্থাও রয়েছে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে প্রায় ২০টি আবাস চালু আছে এবং আরও কিছু নির্মাণাধীন। একটি আবাসে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ জন থাকতে পারেন, বড়গুলিতে ১৮ থেকে ২০ জন পর্যন্ত অবস্থান সম্ভব। অতিথিদের ব্যক্তিগত গোপনতা ও খাবারের মানের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সন্ধ্যায় গ্রামীণ গানের আসর

রাত নামতেই বসে লোকগানের আসর। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় ঢোলের তালে তালে শোনা যায় বাউলধর্মী গান। বহুদিনের হারানো গ্রামীণ সন্ধ্যার আবহ ফিরিয়ে আনতেই এই আয়োজন।

দলের প্রধান ঢোলবাদক মোহাম্মদ মোস্তফা জানান, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে আগত দর্শনার্থীদের জন্য গান পরিবেশন করছেন, যাতে মানুষ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশের স্বাদ নিতে পারেন।

ভেষজ পরিচর্যা ও প্রশান্তির আয়োজন

এখানে রয়েছে ভেষজভিত্তিক পরিচর্যা কেন্দ্র। প্রাকৃতিক তেল ব্যবহার করে শরীর মালিশ, পদচাপ চিকিৎসা ও সমন্বিত আরামদায়ক পরিচর্যার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সবুজে ঘেরা নীরব পরিবেশে এই সেবাগুলো দর্শনার্থীদের মানসিক স্বস্তি এনে দেয়।

পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে অবকাশের নতুন ঠিকানা

প্রকৃতির মাঝখানে আধুনিক সুবিধা ও গ্রামীণ আবহের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই অবকাশকেন্দ্র পরিবার, বন্ধু কিংবা দলগত ভ্রমণের জন্য হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। শহরের কাছেই স্বল্প সময়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতা খুঁজছেন এমন মানুষদের জন্য এটি এক নতুন সংযোজন।