বর্ষা শেষে নদীর স্রোত শান্ত হলে গাইবান্ধার চরগুলো যেন জলের বুকে ভেসে ওঠা সবুজ দ্বীপ। শরতের কাশফুল, হেমন্তের রোদ, আর পলিমাটির উর্বরতায় ভরা ফসলের মাঠ মিলিয়ে এই চরভূমি এখন শুধু কৃষির নয়, সম্ভাবনাময় কৃষি পর্যটনেরও নতুন দিগন্ত হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন বন্যা ও ভাঙনের গল্পে পরিচিত এসব চর আজ নতুন সম্ভাবনার আলোচনায়।

তিস্তা নদী, ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদী বেষ্টিত সুন্দরগঞ্জ উপজেলা, গাইবান্ধা সদর উপজেলা, ফুলছড়ি উপজেলা ও সাঘাটা উপজেলা মিলিয়ে বিস্তৃত এলাকায় গড়ে উঠেছে ১৬৫টি চর ও দ্বীপচর। এসব চরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। নদীর ভাঙন আর স্রোতের সঙ্গে লড়াই করেই তারা পলিমাটিকে রূপ দিয়েছেন উর্বর কৃষিজমিতে। অনেক চরে এখন বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল উৎপাদন হচ্ছে নিয়মিতভাবে।

ধান, ভুট্টা, মরিচ, চিনাবাদাম, তিল, শাকসবজি ও মিষ্টি কুমড়াসহ ২০টির বেশি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে এসব চরে। পেঁয়াজ, রসুন ও বাদামের আবাদও বাড়ছে। কোথাও গবাদিপশু পালন, কোথাও দুধ উৎপাদন। ফলে কৃষি এখানে শুধু জীবিকা নয়, একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ভিত্তি।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জিইউকের প্রধান নির্বাহী ও চর গবেষক এম. আবদুস সালাম বলেন, কৃষিনির্ভর এই জীবনযাপনকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা থেকেই কৃষি পর্যটনের ভাবনা এসেছে। পর্যটকেরা সরাসরি কৃষিজমি, ফসল তোলা, গ্রামীণ জীবনধারা ও স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন। সকালে খেত পরিদর্শন, কৃষকের সঙ্গে মাঠে কাজ, দুপুরে টাটকা সবজি দিয়ে রান্না খাবার, বিকেলে নদীতে নৌভ্রমণ এবং সূর্যাস্ত দেখা—এই অভিজ্ঞতাভিত্তিক আয়োজনই হতে পারে বড় আকর্ষণ।

কৃষিবিদ সাদেকুল ইসলাম মনে করেন, চরাঞ্চলের বড় শক্তি বিষমুক্ত চাষাবাদের সম্ভাবনা। নদীর পলিমাটি প্রাকৃতিকভাবে উর্বর হওয়ায় তুলনামূলক কম রাসায়নিক ব্যবহারেই ভালো ফলন সম্ভব। অনেক কৃষক ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করছেন। এ ধরনের পণ্যকে আলাদা পরিচিতি দেওয়া গেলে কৃষক সরাসরি লাভবান হবেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমবে।

বালাশীঘাট ইতোমধ্যে গাইবান্ধার পরিচিত নদীকেন্দ্রিক ভ্রমণস্থল। ব্রহ্মপুত্রের তীরে দাঁড়িয়ে দূরের চরভূমির বিস্তীর্ণ বালুচর ও আকাশের মিলনরেখা দেখতে প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভিড় করেন। স্থানীয়দের মতে, নিরাপদ জেটিঘাট, পরিকল্পিত নৌভ্রমণ, আবাসন ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বালাশীঘাটকে কেন্দ্র করে চরভিত্তিক কৃষি পর্যটনের রুট গড়ে তোলা সম্ভব।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অধিকাংশ চরে যাতায়াতের জন্য নৌকাই ভরসা। বর্ষায় স্রোত তীব্র, শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা কমে যায়। অনেক স্থানে পাকা রাস্তা, জরুরি চিকিৎসা সুবিধা ও মানসম্মত আবাসনের ঘাটতি রয়েছে। পরিবেশ আন্দোলন গাইবান্ধার সভাপতি ওয়াজিউর রহমান রাফেল বলেন, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বড় বিবেচ্য বিষয়। পরিকল্পিত চর উন্নয়ন, নদীশাসন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ ছাড়া স্থায়ী বিনিয়োগ কঠিন।

তবু আশাবাদী স্থানীয়রা। অনেক পরিবার বাড়িভিত্তিক আবাসনের উদ্যোগ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। নারীরা ঘরে তৈরি পিঠা, দুধজাত পণ্য ও হস্তশিল্প বিক্রির সুযোগ পেতে পারেন। তরুণরা গাইড, নৌচালক কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হতে পারে। এতে মৌসুমি কৃষিকাজের বাইরে বিকল্প আয় তৈরি হবে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, গাইবান্ধার চরাঞ্চলকে কৃষি, সংস্কৃতি ও প্রকৃতিনির্ভর সমন্বিত প্যাকেজ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। মৌসুমি ফসল উৎসব, চরভিত্তিক কৃষি মেলা, পাখি পর্যবেক্ষণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সফর জাতীয় পর্যায়ে আগ্রহ বাড়াতে পারে। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত মহাপরিকল্পনা, যেখানে কৃষি বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন একসঙ্গে কাজ করবে।

সরকারি প্রণোদনা, সহজ ঋণ ও করসুবিধা দেওয়া গেলে বেসরকারি বিনিয়োগও বাড়তে পারে। পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, সৌরবিদ্যুৎনির্ভর আবাসন ও সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে গাইবান্ধার চরাঞ্চল টেকসই কৃষি পর্যটনের মডেল হয়ে উঠতে পারে।