সিলেটের জাফলং মানেই পর্যটকদের মনে ভেসে ওঠে স্বচ্ছ পিয়াইন নদের বুকে ছড়িয়ে থাকা নুড়িপাথর, পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনা আর ভারতের সীমানা ছুঁয়ে থাকা সবুজ প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে পিয়াইন নদের ওপারে লুকিয়ে আছে আরেক জগৎ। সেখানে বাস করেন খাসিয়া জনগোষ্ঠীর মানুষ, যাঁদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য এখনো বহন করে চলেছে শতবর্ষের পুরনো এক অনন্য ধারা। সেই জনপদে এখন পর্যটকদের জন্য খুলে গেছে হোমস্টের দরজা। সাধারণ জাফলং ভ্রমণকে ছাপিয়ে যারা অন্যরকম অভিজ্ঞতা চান, তাঁদের জন্য এটি হতে পারে এক অবিস্মরণীয় গন্তব্য।
কমিউনিটি ট্যুরিজমের শুরু
২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথ উদ্যোগে জাফলংয়ের খাসিয়াপুঞ্জিতে চালু হয়েছে কমিউনিটি ট্যুরিজম কার্যক্রম। এই উদ্যোগের আওতায় তিনটি পুঞ্জিতে এখন পর্যন্ত চারটি হোমস্টে চালু হয়েছে, যেখানে একসঙ্গে অন্তত ১৫ জন পর্যটক খাসিয়াদের বাড়িতে রাত কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
জাফলং জিরো পয়েন্টের বল্লার ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পিয়াইন নদ পার হলেই শুরু হয় খাসিয়া জনপদের গল্প। ঘাটে নামতেই পর্যটকদের স্বাগত জানান খাসিয়া সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণী গাইডরা, যাঁরা পড়াশোনার পাশাপাশি ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করছেন। তাঁরা পর্যটকদের নিয়ে যান খাসিয়া কমিউনিটি মিশনে, যেখানে স্থানীয় খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ের পাশে দুটি কক্ষ নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি হোমস্টে।
পুঞ্জির জীবন ও হোমস্টে
আরেকটু সামনে এগোলে একে একে দেখা মেলে নকশিয়াপুঞ্জি আর লামাপুঞ্জির। খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিটি পাড়া বা মহল্লাকে বলা হয় পুঞ্জি। এক পুঞ্জি থেকে আরেক পুঞ্জিতে যাওয়ার পথে দুই পাশে চোখে পড়ে সুপারি আর পানের বরজ। পুঞ্জিগুলোতে খাসিয়াদের বাড়িগুলো যেন ছবির মতো সাজানো। মাটি থেকে উঁচু মাঁচার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি বাড়ি এবং তার উঠান একদম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। গাইড সেভেনলী খংস্তিয়া জানান, প্রাচীনকালে জীবজন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে এভাবে মাঁচার ওপর বাড়ি নির্মাণের রীতি চালু হয়েছিল। সেই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে।
নকশিয়াপুঞ্জির হেডম্যান ওয়েলকাম লাম্বা দুই ভাই মিলে দুটি হোমস্টে চালু করেছেন। তিনি জানান, শুরুতে এই উদ্যোগ নিয়ে তাঁদের কিছুটা দ্বিধা ছিল, তবে এখন ধারণা বদলে গেছে। নিজেদের পড়ে থাকা দুটি কক্ষ গুছিয়ে এবং শৌচাগার সুবিধা সামান্য উন্নত করেই তাঁরা শুরু করেছিলেন এই যাত্রা। এখন দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা সেখানে এসে রাত কাটাচ্ছেন এবং তাঁদের বাড়তি আয়ের পথও খুলে গেছে।
খাবারের স্বাদ ও সংস্কৃতির পরশ
পুঞ্জিতে ঘোরার ফাঁকে পর্যটকেরা রমলা রেস্টুরেন্ট নামের কমিউনিটি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার সারতে পারেন। এখানে দেশীয় খাবারের পাশাপাশি পরিবেশন করা হয় খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী পদ। বিন্নি চালের পোলাও, ডকলে বা চিকেন সালাদ, বাঁশকোঁড়ল, কাঁঠাল-শুঁটকির তরকারি, সরওয়া অর্থাৎ স্যুপ এবং চিকেন ভুনা প্রতিবেলার খাবারে পাওয়া যায়। প্রতিজনের জন্য খরচ পড়ে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। রেস্টুরেন্টটি স্থানীয় বাসিন্দারাই পরিচালনা করেন।
বিকেলে লামাপুঞ্জিতে খাসিয়া শিশুরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে খাসিয়া ভাষার গানের তালে পর্যটকদের সামনে নৃত্য পরিবেশন করে। সন্ধ্যায় কমিউনিটি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত খাসিয়াদের ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কৃষিকাজে ব্যবহৃত প্রাচীন সামগ্রী ও যুদ্ধাস্ত্রের মিনিয়েচার দেখার সুযোগ পান ভ্রমণকারীরা।
পরদিন সকালে পানচাষির সঙ্গে সরাসরি দেখা যায় পানপাতা সংগ্রহের প্রক্রিয়া। পানপাতা খাসিয়াদের কাছে পবিত্র, তাই প্রতিদিন ভোরে গোসল সেরে পরিষ্কার অবস্থায় পানচাষিরা এ কাজটি করেন। পান ও সুপারিই মূলত খাসিয়াদের জীবিকার প্রধান উৎস। তবে পর্যটনের এই নতুন ধারা তাঁদের সামনে দিনবদলের আরেকটি পথ খুলে দিচ্ছে।
যা জানা দরকার বুকিংয়ের আগে
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপপরিচালক কাবিল মিঞা জানান, খাসিয়া কমিউনিটির বাসিন্দাদের সঙ্গে বহুবার মতবিনিময় ও কর্মশালার মাধ্যমে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে আরও অনেক খাসিয়া পরিবার হোমস্টে চালুতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এই পর্যটনের সুবাদে কক্ষভাড়ার আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় অটোরিকশাচালক, দোকানি ও গাইডরাও বাড়তি উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে এই মুহূর্তে রাতযাপনের সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। ভ্রমণের আগে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করে অনুমতি নিতে হবে। ভবিষ্যতে কমিউনিটি ট্যুরিজম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। সিলেট ভ্রমণে যাঁরা জাফলংয়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভিন্নধর্মী এক জীবনের গল্পের সঙ্গে পরিচিত হতে চান, তাঁদের জন্য জাফলংয়ের খাসিয়াপুঞ্জি এখন হয়ে উঠছে এক আদর্শ গন্তব্য।সিলেটের জাফলং মানেই পর্যটকদের মনে ভেসে ওঠে স্বচ্ছ পিয়াইন নদের বুকে ছড়িয়ে থাকা নুড়িপাথর, পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনা আর ভারতের সীমানা ছুঁয়ে থাকা সবুজ প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে পিয়াইন নদের ওপারে লুকিয়ে আছে আরেক জগৎ। সেখানে বাস করেন খাসিয়া জনগোষ্ঠীর মানুষ, যাঁদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য এখনো বহন করে চলেছে শতবর্ষের পুরনো এক অনন্য ধারা। সেই জনপদে এখন পর্যটকদের জন্য খুলে গেছে হোমস্টের দরজা। সাধারণ জাফলং ভ্রমণকে ছাপিয়ে যারা অন্যরকম অভিজ্ঞতা চান, তাঁদের জন্য এটি হতে পারে এক অবিস্মরণীয় গন্তব্য।
কমিউনিটি ট্যুরিজমের শুরু
২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথ উদ্যোগে জাফলংয়ের খাসিয়াপুঞ্জিতে চালু হয়েছে কমিউনিটি ট্যুরিজম কার্যক্রম। এই উদ্যোগের আওতায় তিনটি পুঞ্জিতে এখন পর্যন্ত চারটি হোমস্টে চালু হয়েছে, যেখানে একসঙ্গে অন্তত ১৫ জন পর্যটক খাসিয়াদের বাড়িতে রাত কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
জাফলং জিরো পয়েন্টের বল্লার ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পিয়াইন নদ পার হলেই শুরু হয় খাসিয়া জনপদের গল্প। ঘাটে নামতেই পর্যটকদের স্বাগত জানান খাসিয়া সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণী গাইডরা, যাঁরা পড়াশোনার পাশাপাশি ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করছেন। তাঁরা পর্যটকদের নিয়ে যান খাসিয়া কমিউনিটি মিশনে, যেখানে স্থানীয় খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ের পাশে দুটি কক্ষ নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি হোমস্টে।
পুঞ্জির জীবন ও হোমস্টে
আরেকটু সামনে এগোলে একে একে দেখা মেলে নকশিয়াপুঞ্জি আর লামাপুঞ্জির। খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিটি পাড়া বা মহল্লাকে বলা হয় পুঞ্জি। এক পুঞ্জি থেকে আরেক পুঞ্জিতে যাওয়ার পথে দুই পাশে চোখে পড়ে সুপারি আর পানের বরজ। পুঞ্জিগুলোতে খাসিয়াদের বাড়িগুলো যেন ছবির মতো সাজানো। মাটি থেকে উঁচু মাঁচার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি বাড়ি এবং তার উঠান একদম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। গাইড সেভেনলী খংস্তিয়া জানান, প্রাচীনকালে জীবজন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে এভাবে মাঁচার ওপর বাড়ি নির্মাণের রীতি চালু হয়েছিল। সেই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে।
নকশিয়াপুঞ্জির হেডম্যান ওয়েলকাম লাম্বা দুই ভাই মিলে দুটি হোমস্টে চালু করেছেন। তিনি জানান, শুরুতে এই উদ্যোগ নিয়ে তাঁদের কিছুটা দ্বিধা ছিল, তবে এখন ধারণা বদলে গেছে। নিজেদের পড়ে থাকা দুটি কক্ষ গুছিয়ে এবং শৌচাগার সুবিধা সামান্য উন্নত করেই তাঁরা শুরু করেছিলেন এই যাত্রা। এখন দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা সেখানে এসে রাত কাটাচ্ছেন এবং তাঁদের বাড়তি আয়ের পথও খুলে গেছে।
খাবারের স্বাদ ও সংস্কৃতির পরশ
পুঞ্জিতে ঘোরার ফাঁকে পর্যটকেরা রমলা রেস্টুরেন্ট নামের কমিউনিটি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার সারতে পারেন। এখানে দেশীয় খাবারের পাশাপাশি পরিবেশন করা হয় খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী পদ। বিন্নি চালের পোলাও, ডকলে বা চিকেন সালাদ, বাঁশকোঁড়ল, কাঁঠাল-শুঁটকির তরকারি, সরওয়া অর্থাৎ স্যুপ এবং চিকেন ভুনা প্রতিবেলার খাবারে পাওয়া যায়। প্রতিজনের জন্য খরচ পড়ে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। রেস্টুরেন্টটি স্থানীয় বাসিন্দারাই পরিচালনা করেন।
বিকেলে লামাপুঞ্জিতে খাসিয়া শিশুরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে খাসিয়া ভাষার গানের তালে পর্যটকদের সামনে নৃত্য পরিবেশন করে। সন্ধ্যায় কমিউনিটি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত খাসিয়াদের ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, কৃষিকাজে ব্যবহৃত প্রাচীন সামগ্রী ও যুদ্ধাস্ত্রের মিনিয়েচার দেখার সুযোগ পান ভ্রমণকারীরা।
পরদিন সকালে পানচাষির সঙ্গে সরাসরি দেখা যায় পানপাতা সংগ্রহের প্রক্রিয়া। পানপাতা খাসিয়াদের কাছে পবিত্র, তাই প্রতিদিন ভোরে গোসল সেরে পরিষ্কার অবস্থায় পানচাষিরা এ কাজটি করেন। পান ও সুপারিই মূলত খাসিয়াদের জীবিকার প্রধান উৎস। তবে পর্যটনের এই নতুন ধারা তাঁদের সামনে দিনবদলের আরেকটি পথ খুলে দিচ্ছে।
যা জানা দরকার বুকিংয়ের আগে
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপপরিচালক কাবিল মিঞা জানান, খাসিয়া কমিউনিটির বাসিন্দাদের সঙ্গে বহুবার মতবিনিময় ও কর্মশালার মাধ্যমে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে আরও অনেক খাসিয়া পরিবার হোমস্টে চালুতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এই পর্যটনের সুবাদে কক্ষভাড়ার আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় অটোরিকশাচালক, দোকানি ও গাইডরাও বাড়তি উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে এই মুহূর্তে রাতযাপনের সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। ভ্রমণের আগে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করে অনুমতি নিতে হবে। ভবিষ্যতে কমিউনিটি ট্যুরিজম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। সিলেট ভ্রমণে যাঁরা জাফলংয়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভিন্নধর্মী এক জীবনের গল্পের সঙ্গে পরিচিত হতে চান, তাঁদের জন্য জাফলংয়ের খাসিয়াপুঞ্জি এখন হয়ে উঠছে এক আদর্শ গন্তব্য।