দক্ষিণ উপকূলের প্রকৃতিতে নীরবে গড়ে উঠছে এক অনন্য জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। নদীর বুকে জেগে ওঠা নতুন ভূমি শুধু ভূগোল বদলায় না, বদলায় মানুষের স্বপ্নও। বরগুনার বেতাগী উপজেলায় বিষখালী নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা ঝোপখালী পাখির চর এখন সেই নতুন স্বপ্নের নাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর পাখির কলতানে ভরা এই চরকে ঘিরে অভয়াশ্রম ও পর্যটন স্পট গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিষখালী নদীর মোহনায় সর্বশেষ জেগে ওঠা দ্বীপচরটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত ঝোপখালী পাখির চর নামে। ছোট বড় নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমন্বয়ে এখানে তৈরি হয়েছে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। চরের ভেতরে বাঁক নিয়ে বয়ে গেছে পাঁচ থেকে সাতটি ছোট নালা। এসব নালায় রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ যা পাখিদের নিরাপদ আবাস গড়ে তুলতে সহায়ক হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জোয়ারের সময় চরটি প্রায় পুরোপুরি পানিতে ঢেকে যায়। তখন নৌকায় ঘুরে উপভোগ করা যায় বিস্তৃত সবুজ বনাঞ্চল আর অসংখ্য পাখির কোলাহল। ভাটার সময় আবার ভেসে ওঠে চরের প্রকৃত রূপ।
বিষখালী নদীর ভাঙনে দক্ষিণ উপকূলের জনপদগুলো দিন দিন সংকুচিত হলেও নতুন করে জেগে ওঠা এই চর স্থানীয় মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছে। ঝোপখালীর চরকে ঘিরে আগামী দশকে আরও ভূমি জেগে ওঠার সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের কাছে এটি শুধু একটি চর নয়, বরং নতুন জীবনের হাতছানি।
ইতোমধ্যে ঝোপখালী পাখির চর পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব খন্দকার নাজমুল হুদা শামিম। তিনি এই চরকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি নান্দনিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের সম্ভাবনা দেখতে একাধিক জেলা প্রশাসকও এলাকা পরিদর্শন করেন।
স্থানীয়রা বলছেন, পাখির কলতান, ছৈলা গাছের ডালে ডালে পাখির বাসা আর চারপাশের সবুজ যে কোনো ভ্রমণপিয়াসী মানুষকে মুগ্ধ করবে। সরকারি নজরদারি ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এখানে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট গড়ে তোলা সম্ভব।
পরিবেশ কর্মী ও পর্যটন উদ্যোক্তা আরিফুর রহমান বলেন, শীত মৌসুমে এই ধরনের দ্বীপচরে প্রচুর অতিথি পাখি আসে। এখানে বালিহাঁস, বক, মদনটাকসহ দেশি বিদেশি নানা প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এটি পাখিদের জন্য আদর্শ আশ্রয়স্থল হতে পারে। তবে পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জরুরি। ডিম পাড়ার জন্য নিরাপদ বক্স স্থাপনের দাবিও জানান তিনি।
পরিবেশ কর্মী ও সাংবাদিকেরা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে একটি পর্যবেক্ষক টিম গঠনের দাবি তুলেছেন। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের বরগুনা জেলা সমন্বয়কারী হাসানুর রহমান বলেন, সম্ভাবনাময় এই জায়গাটি এখনো অনেকের অজানা। উপজেলা থেকে বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সংগঠনের বেতাগী উপজেলা সভাপতি সাইদুল ইসলাম মন্টু বলেন, সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে এখান থেকে রাজস্ব আয়ের বড় সুযোগ তৈরি হবে।
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহা সাদ্দাম হোসেন জানান, যেখানে পাখিরা অবস্থান করে সেখানে কোনো স্থাপনা করা হবে না। একটু দূরে বসার বেঞ্চ নির্মাণ করা হচ্ছে যাতে দর্শনার্থীরা দূর থেকেই পাখি দেখতে পারেন। ঈদের আগেই কাজ শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পাখি শিকার করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ঝোপখালী পাখির চরকে অভয়াশ্রম ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং জেলা পর্যায়ে একটি পর্যটন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেতাগী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চরের নামকরণ ফলক স্থাপন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়। এর আগে ২০২১ সালে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা প্রথম এই চরটির অস্তিত্ব তুলে ধরেন।
বরগুনা ২ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মণি বলেন, ঝোপখালী পাখির চরকে অভয়াশ্রম ও পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।