বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি আর সবুজ ঝাউবনের মিলনে একসময় মুগ্ধ করত বরগুনার শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত। দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসতেন এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের টানে। কিন্তু সাগরের নিরন্তর ঢেউয়ের আঘাতে সেই স্বপ্নের সৈকত আজ অস্তিত্বের সংকটে। ভাঙনের করাল গ্রাসে একে একে বিলীন হচ্ছে সৈকতের বিস্তীর্ণ অংশ, ধ্বংস হচ্ছে হাজার হাজার ঝাউগাছ, আর ফিকে হয়ে আসছে এই অঞ্চলের পর্যটন ভবিষ্যৎ।
বরগুনার তালতলী উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া এলাকায় অবস্থিত শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত। পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এ সৈকতের আয়তন একসময় ছিল সাড়ে চার কিলোমিটারের বেশি। তবে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের অব্যাহত আঘাতে সৈকতটি দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। শুধু সৈকত নয়, ভাঙনের শিকার হয়েছে সৈকত সংলগ্ন সংরক্ষিত ঝাউবাগানও। ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ হাজার ঝাউগাছ সাগরে বিলীন হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে সৈকতে গিয়ে দেখা যায়, সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে উপড়ে পড়ে আছে শতশত ঝাউগাছ। সৈকতে নামার জন্য নির্মিত পাকা সড়কটিও ভেঙে পড়েছে। পর্যটকদের রাত্রিযাপনের জন্য সরকারিভাবে সাম্পান নামে একটি দুই কক্ষবিশিষ্ট ডাকবাংলো নির্মাণ করা হলেও সেখানে খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে একদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে নানা অব্যবস্থাপনায় দূর থেকে আসা পর্যটকরা পড়ছেন বিপাকে।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা পর্যটক নাজনীন আক্তার জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্লগ দেখে ও মানুষের কাছে শুনে তারা এসেছিলেন। কিন্তু সৈকতের সার্বিক অবস্থা দেখে হতাশ হয়েছেন। তিনি বলেন, এরকম অবস্থা চলতে থাকলে মানুষকে এখানে না আসতেই উৎসাহিত করব।
রূপালী ব্যাংক বরগুনা শাখার কর্মকর্তা মো. মাসুম জানান, বনের বিশাল অংশ সাগরে বিলীন হয়ে গেছে, ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে সৈকতজুড়ে। ভাঙন ঠেকাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগও দরকার বলে মনে করেন তিনি।
২০১৯ সালে প্রথমবার আসা পর্যটক ফাতিমা আক্তার এবার এসে জানান, সৈকতটি আগের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট ও বনের গাছপালা দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। আরেক পর্যটক মো. আব্দুল লতিফও জানান, আগে যে পরিমাণ পর্যটক আসতেন, এখন তার ছিটেফোঁটাও নেই।
এ বিষয়ে বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধান জানান, শুভসন্ধ্যা সৈকতের ভাঙন তাদের নজরে এসেছে। স্থানীয়দের মানববন্ধন ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের চিঠির পর জেলা সমন্বয় সভায়ও বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে জিও টিউব ব্যবহারের জন্য একটি বাজেট প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
স্থানীয়রা মনে করেন, ভাঙনরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে শুধু সৈকত ও বনাঞ্চল রক্ষা নয়, এ অঞ্চলে পর্যটকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে বরগুনার এই অনন্য পর্যটনস্পটটি একদিন কেবল স্মৃতিতেই থাকবে।