শীতের শেষ বেলায় যখন প্রকৃতি নতুন রঙে সাজছে, তখন উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় চোখ জুড়ানো এক দৃশ্যের অপেক্ষায় থাকেন হাজারো মানুষ। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে এবারও। দর্জিপাড়া গ্রামের ৬০ শতক জমিজুড়ে ফুটে উঠেছে রাজকীয় টিউলিপ। পঞ্চমবারের মতো বাংলাদেশের মাটিতে ফোটা এই ভিনদেশি ফুল দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন দর্শনার্থীরা।

বাগানে পা রাখতেই চোখে পড়ে রঙিন সাজে সজ্জিত নান্দনিক প্রবেশপথ। ভেতরে যেন একটি জীবন্ত ক্যানভাস। লালিবেলা, ডেনমার্ক, স্ট্রং গোল্ড, মিস্টিক ভ্যান ইজকসহ পাঁচ রঙের প্রায় ১৪ হাজার টিউলিপ রাজকীয় ভঙ্গিতে দুলছে মৃদু বাতাসে। সূর্যের আলো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বসানো বিশেষ শেড বাগানটিকে দিয়েছে এক স্নিগ্ধ ও অনন্য রূপ।

টিকিট কেটে বাগানে প্রবেশ করছেন ভ্রমণপিপাসুরা। কেউ প্রিয়জনের হাতে তুলে দিচ্ছেন টিউলিপ, কেউ আবার সেলফিতে ধরে রাখছেন এই রঙিন মুহূর্ত।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) উদ্যোগে ১০ জন প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তার শ্রম ও স্বপ্নে গড়ে উঠেছে এই বাগান। ২০২২ সালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে যাত্রা শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করছে।

চাষি রবিউল ইসলাম জানান, নেদারল্যান্ডস থেকে প্রতিটি বাল্ব আনতে খরচ পড়ে প্রায় ৮০ টাকা। প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে ফোটানো প্রতিটি টিউলিপ স্টিক বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকাতেও যাচ্ছে এই ফুল এবং চাহিদাও ঊর্ধ্বমুখী।

টিউলিপ মূলত শীতপ্রধান দেশের ফুল। দিনে ১৫ ডিগ্রি ও রাতে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এর চাষের জন্য উপযুক্ত। রোপণের ১৮ থেকে ২০ দিনের মধ্যে কলি আসে এবং অনুকূল আবহাওয়ায় ফুল ২৫ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত টিকে থাকে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন জানান, পঞ্চগড়ের আবহাওয়া টিউলিপ চাষের জন্য অনুকূল প্রমাণিত হয়েছে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে এই চাষ ছড়িয়ে দিতে কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

ইএসডিও-র প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান বলেন, ক্ষুদ্র চাষিদের স্বাবলম্বী করা এবং বিদেশ থেকে টিউলিপ আমদানি কমানোই তাদের মূল লক্ষ্য। পাঁচ বছর আগে দেখা স্বপ্ন এখন বাস্তব রূপ পেয়েছে এবং তেঁতুলিয়ায় ইকো-কমিউনিটি ট্যুরিজম গড়ে তোলার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।