প্রকৃতির নিয়মে শীতের ক্লান্তি সরিয়ে আবারও এসেছে ঋতুরাজ বসন্ত। পঞ্জিকার হিসাবে ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি সাধারণ দিন হলেও বাঙালির আবেগে এটি দ্বিগুণ তাৎপর্যের। আজ পহেলা ফাল্গুন, একই দিনে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। ঋতুর রঙ আর অনুভূতির উচ্ছ্বাস মিলিয়ে দিনটি যেন একসঙ্গে প্রকৃতি ও মানবিকতার উৎসব হয়ে উঠেছে।

রাজধানী ঢাকা আজ সকাল থেকেই বসন্তের আবহে মুখর। ফুলের দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড়, তরুণদের হাতে লাল গোলাপ, আর বাসন্তী রঙের পোশাকে নগরজীবন পেয়েছে নতুন মাত্রা। শাহবাগ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা জুড়ে চলছে উৎসবমুখর আয়োজন। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসন্তবরণের ঐতিহ্য নতুন করে প্রাণ পেয়েছে।

ইতিহাস ও পঞ্জিকার বদলে একদিনে দুই উৎসব

একদিনে দুই উৎসবের মিলন কেবল কাকতালীয় নয়, এর পেছনে রয়েছে পঞ্জিকা সংশোধনের ইতিহাস। আগে পহেলা ফাল্গুন পালিত হতো ১৩ ফেব্রুয়ারি। ২০১৯ সালে বাংলা একাডেমি বাংলা বর্ষপঞ্জি সংশোধন করার পর ২০২০ সাল থেকে ফাল্গুনের প্রথম দিন আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত হয়। ফলে বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবস এখন একই দিনে উদযাপিত হচ্ছে।

ফাল্গুন মানেই দ্রোহ ও প্রেমের স্মৃতি

বাঙালির কাছে ফাল্গুন কেবল ঋতুর পরিবর্তন নয়, এটি আত্মপরিচয়েরও প্রতীক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি এই মাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সেই ইতিহাস ফাল্গুনকে দিয়েছে প্রতিবাদের শক্তি, আর বসন্ত দিয়েছে ভালোবাসার রং।
আনুষ্ঠানিক বসন্ত উৎসব শুরু হয় ১৪০১ বঙ্গাব্দে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রাঙ্গণে ছোট পরিসরের আয়োজন থেকে শুরু হয়ে আজ তা সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।

ভালোবাসা দিবসের ঐতিহাসিক পটভূমি

বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের ইতিহাসও বহু পুরোনো। প্রচলিত মতে, রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস তরুণদের বিয়ে নিষিদ্ধ করেছিলেন যুদ্ধের স্বার্থে। সেই সময় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন গোপনে প্রেমিক যুগলদের বিয়ে দিতেন। এ কারণে ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর স্মরণেই দিনটি ভালোবাসা দিবস হিসেবে পরিচিতি পায়।

বাংলাদেশে দিবসটির জনপ্রিয়তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সাংবাদিক শফিক রেহমান। নব্বইয়ের দশকে তিনি দিনটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন, যা ধীরে ধীরে তরুণ সমাজে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

শহর বনাম গ্রামে বসন্তের আলাদা রূপ

নগরজীবনে বসন্ত মানেই রঙিন পোশাক, আড্ডা আর ছবি তোলার উৎসব। রমনা পার্ক, চন্দ্রিমা উদ্যান, হাতিরঝিল এলাকায় দিনভর মানুষের ভিড় থাকে।
অন্যদিকে গ্রামবাংলায় বসন্ত আসে নিঃশব্দে। আমের মুকুলের গন্ধ, কোকিলের ডাক আর উঠোনভরা গাঁদা ফুলের সাজে সেখানে ঋতুকে বরণ করা হয়। অনেক স্থানে বসে গ্রামীণ মেলা, যেখানে ভালোবাসা দিবস আলাদা কোনো নামে নয়, পারিবারিক স্নেহ আর আন্তরিকতার মধ্যেই প্রকাশ পায়।

উৎসবের নগরচিত্র

সকাল থেকেই রাজু ভাস্কর্য এলাকা তরুণদের পদচারণায় সরব। হলুদ পাঞ্জাবি, বাসন্তী শাড়ি আর লাল গোলাপের সমাহারে পুরো পরিবেশ যেন জীবন্ত ক্যানভাস। ক্যাফে ও রেস্তোরাঁগুলোতেও বাড়তি ভিড়, দিনটি ঘিরে চলছে নানা আয়োজন।