বিমানভ্রমণকে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ পরিবহন ধরা হলেও এটি মানবদেহের ওপর কিছু বিশেষ রকমের চাপ সৃষ্টি করে। বেশির ভাগ যাত্রীর ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন তেমন কোনো সমস্যা তৈরি করে না ঠিকই, কিন্তু কারও কারও জন্য তা হঠাৎ স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।

নতুন এক গবেষণার বরাতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট লিখেছে, বর্তমানে প্রতি ২১২টির মধ্যে একটি ফ্লাইটে কোনো না কোনো ধরনের চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়। অথচ ২০১৩ সালে এ হার ছিল প্রতি ৬০৪টি ফ্লাইটে একটি। এসব ঘটনার মধ্যে ছোটখাটো আঘাত থেকে শুরু করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, এমনকি হৃদ্‌রোগের মতো গুরুতর অসুস্থতাও রয়েছে।

কেবিনের চাপ ও অক্সিজেনের প্রভাব
বিমানের কেবিনের বায়ুচাপ সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮ হাজার ফুট উচ্চতার সমতুল্য রাখা হয়। এতে বাতাসে অক্সিজেনের কার্যকর মাত্রা কমে যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠে বাতাসে প্রায় ২১ শতাংশ অক্সিজেন থাকলেও, বিমানের কেবিনে তা কার্যত প্রায় ১৫ শতাংশের সমতুল্য অনুভূত হয়।

এই ঘাটতি পূরণ করতে শরীর দ্রুত শ্বাস নিতে শুরু করে এবং হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যায়, যাতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায়। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত সমস্যা তৈরি না করলেও, হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

পানিশূন্যতার ঝুঁকি
বিমানের কেবিনে আর্দ্রতার মাত্রা খুবই কম থাকে। ফলে ত্বক, চোখ, নাক ও গলা দ্রুত শুষ্ক হয়ে যায়। গবেষকদের মতে, একজন যাত্রীর শরীর থেকে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩৬০ মিলিলিটার পর্যন্ত পানি হারাতে পারে।
এই পানিশূন্যতায় রক্ত কিছুটা ঘন হয়ে যায়, ফলে হৃদ্‌যন্ত্রকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। একই সঙ্গে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকিও বাড়ে, যা ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিসের মতো জটিলতার কারণ হতে পারে।

কেন অনেকেই বিমানে অজ্ঞান হয়ে যান?
বিমানে চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ঘটনা হলো অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। বিমানসংক্রান্ত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জরুরি ঘটনার সঙ্গে এটি জড়িত।
অনেকক্ষণ বসে থাকার পর হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলে রক্ত পায়ে জমে যায় এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। এর সঙ্গে যদি পানিশূন্যতা বা অ্যালকোহল পান যুক্ত হয়, তাহলে অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

পেটের সমস্যাও বাড়তে পারে
উচ্চতায় ওঠার পর অন্ত্রে থাকা গ্যাস প্রসারিত হয়। ফলে অনেকের পেটে অস্বস্তি বা অতিরিক্ত গ্যাসের সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে বিনস, ব্রকোলি, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, লাল মাংস, মসুর ডাল ও গ্লুটেনসমৃদ্ধ খাবার এ সমস্যা আরও বাড়াতে পারে।
বিরল ক্ষেত্রে তীব্র ডায়রিয়ার মতো সমস্যার কারণে মাঝপথ থেকে বিমান ঘুরিয়ে আনতেও হয়েছে।

হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি
বিমানে হৃদ্‌রোগ বা স্ট্রোকের ঘটনা খুব বেশি না হলেও, এমন পরিস্থিতিতে মৃত্যুঝুঁকি মাটির তুলনায় বেশি হতে পারে। কারণ, বিমানে চিকিৎসা সরঞ্জাম সীমিত এবং সব সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপস্থিত থাকেন না।

নিরাপদ ভ্রমণের জন্য যা করবেন
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, উড়োজাহাজে ওঠার আগে ও ভ্রমণের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করুন। নিয়মিত ওষুধ খেলে সময়মতো সেগুলো গ্রহণ করুন। প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর সম্ভব হলে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করুন, যাতে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ উচ্চতায় এর প্রভাব আরও বেড়ে যায়।
এ ছাড়া সম্প্রতি অস্ত্রোপচার, দাঁতের চিকিৎসা বা স্কুবা ডাইভিং করে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দ্রুত বিমান ভ্রমণ না করাই নিরাপদ। বিশেষ করে ডাইভিংয়ের পর সাধারণভাবে কমপক্ষে ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানে কোনো যাত্রী অসুস্থ হলে সব সময় জরুরি অবতরণের প্রয়োজন হয় না। পরিস্থিতির গুরুত্ব, চিকিৎসা সহায়তার সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন বিমানের ক্যাপ্টেন।