দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনের জন্য পরিচিত জাপান এবার ভ্রমণপ্রেমীদের সামনে তুলে ধরেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। দক্ষিণাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপে চলাচলকারী বিলাসবহুল ট্রেন ‘সেভেন স্টার্স ইন কিউশু’ যাত্রীদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার বদলে ধীরগতির আরামদায়ক ভ্রমণের মাধ্যমে প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও স্থানীয় ঐতিহ্য উপভোগের সুযোগ করে দেয়। সীমিত আসন, ব্যক্তিগত সেবা এবং রাজকীয় সুযোগ-সুবিধার কারণে এটি বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত লাক্সারি স্লিপার ট্রেনগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।

২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করা জেআর কিউশু পরিচালিত এই ট্রেনটি জাপানের প্রথম বিলাসবহুল ক্রুজ ট্রেন। এর নামের সঙ্গে কিউশুর সাতটি প্রশাসনিক অঞ্চল এবং এই অঞ্চলের সাতটি প্রধান আকর্ষণের সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতি, স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং আতিথেয়তাকে কেন্দ্র করেই এর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রখ্যাত শিল্প নকশাকার এইজি মিতোকার নকশায় তৈরি ট্রেনটির প্রতিটি বগিতে ঐতিহ্যবাহী জাপানি কারুশিল্প ও আধুনিক বিলাসিতার সমন্বয় দেখা যায়। স্থানীয় কাঠ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তৈরি অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ট্রেনটিকে একটি চলমান বুটিক হোটেলের রূপ দিয়েছে।

ফুকুওকার হাকাতা স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু ও শেষ হওয়া এই ট্রেনে মৌসুমভেদে দুটি ভ্রমণ প্যাকেজ রয়েছে। একটি ২ দিন ১ রাতের উত্তর কিউশু সফর এবং অন্যটি ৪ দিন ৩ রাতের ফ্ল্যাগশিপ সফর। দীর্ঘ সফরে ট্রেনটি ফুকুওকা, ওইতা, মিয়াজাকি, কাগোশিমা, কুমামোতো ও নাগাসাকিসহ কিউশুর গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ভ্রমণ করে। পথে আগ্নেয়গিরি, সমুদ্র উপকূল, উষ্ণ প্রস্রবণ, পাহাড়ি জনপদ ও ঐতিহাসিক শহরের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

এশিয়ার অন্যতম ব্যয়বহুল এই ট্রেনের ভাড়াও বেশ চমকপ্রদ। ২ দিন ১ রাতের সফরে দুজনের স্যুট কেবিনে জনপ্রতি ভাড়া ৭ লাখ ইয়েন থেকে শুরু হয়ে একজনের ডিএক্স স্যুটে ১৬ লাখ ইয়েন পর্যন্ত। আর ৪ দিন ৩ রাতের ফ্ল্যাগশিপ সফরে ভাড়া শুরু হয় ১৩ লাখ ৫০ হাজার ইয়েন থেকে, যা ডিএক্স স্যুটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৮ লাখ ৫০ হাজার ইয়েন পর্যন্ত পৌঁছায়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ আনুমানিক ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকারও বেশি। ভাড়ার মধ্যে আবাসন, খাবার, পানীয় এবং নির্ধারিত দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।

ট্রেনটির অন্যতম আকর্ষণ ব্যক্তিগত সেবা। সীমিতসংখ্যক যাত্রী বহন করায় প্রত্যেকেই বিশেষ যত্ন পান। প্রশস্ত জানালা দিয়ে পুরো যাত্রাপথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। ডাইনিং কারে কিউশুর ঐতিহ্যবাহী খাবার, তাজা সামুদ্রিক মাছ, মৌসুমি ফল এবং স্থানীয় সাকে পরিবেশন করা হয়।

শুধু ট্রেন ভ্রমণ নয়, যাত্রীদের জন্য স্থানীয় মৃৎশিল্পের গ্রাম, ঐতিহাসিক মন্দির এবং ঐতিহ্যবাহী কর্মশালা পরিদর্শনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক চাহিদা এবং আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় এই ট্রেনের টিকিট লটারি পদ্ধতিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তাই গন্তব্যের চেয়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে যারা বেশি গুরুত্ব দেন, তাদের কাছে ‘সেভেন স্টার্স ইন কিউশু’ একটি স্বপ্নের যাত্রা।