মৃত্যুর সঙ্গে মানুষ সাধারণত নীরবতাকেই বেশি যুক্ত করে। প্রিয় মানুষটি আর কথা বলবেন না, হাসবেন না, ফোন করবেন না— এই শূন্যতা ঘিরেই তৈরি হয় শোক। কিন্তু নেপালের প্রাচীন শহর ভক্তপুরে মৃত্যুকে ঘিরে পালিত হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উৎসব— সা পারু, যা গাই জাত্রা নামেও পরিচিত।
নেপালের নিউয়ার সম্প্রদায়ের এই বার্ষিক উৎসবে গত এক বছরে যারা মারা গেছেন, তাদের স্মরণ করা হয় আনন্দ, নাচ, গান ও বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে। পাশ্চাত্য সমাজে যেখানে মৃত্যুতে কালো পোশাক ও নীরব শোকের প্রচলন, সেখানে নেপালে এটি হয়ে ওঠে প্রিয়জনকে আনন্দের সঙ্গে বিদায় জানানোর আয়োজন।
উৎসবের আগে ভক্তপুরের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়রা বাঁশ দিয়ে বিশেষ কাঠামো তৈরি করেন, যার নাম ‘তাহা সা’। ঐতিহ্যগতভাবে এসব শোভাযাত্রায় গরু ব্যবহার করা হতো। এখন তার পরিবর্তে বাঁশের কাঠামোর ওপরে পবিত্র গরুর ছবি বসানো হয়। এরপর মৃত ব্যক্তির ছবি, শিবের প্রতিকৃতি এবং রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য একটি ছাতা দিয়ে সাজানো হয়। নারীদের জন্য সাধারণত লাল এবং পুরুষদের জন্য সাদা কাপড় ব্যবহার করা হয়।
এই আয়োজন একা কোনো পরিবারের পক্ষে করা সম্ভব নয়। প্রতিবেশী ও স্থানীয় মানুষ একসঙ্গে কাঠামো তৈরি, সাজসজ্জা ও শোভাযাত্রায় অংশ নেন। অর্থাৎ, জীবনের শেষ প্রান্তে একজন মানুষকে স্মরণ করতেও এখানে পুরো সম্প্রদায় একত্রিত হয়।
মূল দিনে সকাল থেকেই ভক্তপুরের রাস্তায় শুরু হয় শোভাযাত্রা। তাহা: সা-এর সঙ্গে থাকে ঢোল, ঘণ্টা ও নানা বাদ্যযন্ত্র। পাশাপাশি জোড়ায় জোড়ায় মানুষ ঘিনতাং ঘিসি নৃত্যে অংশ নেন। কেউ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে, আবার কেউ ফুটবল জার্সি বা হাওয়াইয়ান শার্ট পরে উৎসবে যোগ দেন। পর্যটকরাও চাইলে এই আনন্দঘন আয়োজনে অংশ নিতে পারেন।
উৎসবটির সঠিক উৎপত্তি নিশ্চিত নয়। ইতিহাসবিদদের ধারণা, এর সূচনা হতে পারে ১৪শ শতকে। রাজা প্রতাপ মল্লের সময় এটি আরও বিস্তৃত হয় বলে মনে করা হয়। কথিত আছে, নিজের সন্তান হারানোর পর রানি যেন কিছুটা স্বস্তি পান, সে জন্য রাজা উৎসবে ব্যঙ্গাত্মক আয়োজন যুক্ত করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় এখনো বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ব্যঙ্গাত্মক মুখোশ দেখা যায়।
ভক্তপুরে সা: পারু এক দিনের নয়, বরং আট দিনব্যাপী উৎসব। এ সময় শহরের বিভিন্ন স্থানে নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা হয়।
তবে ভক্তপুরের আকর্ষণ শুধু এই উৎসবেই সীমাবদ্ধ নয়। ঐতিহাসিক দরবার স্কয়ার, মৃৎশিল্পের চত্বর, স্থানীয় কারুশিল্প এবং হিন্দু-বৌদ্ধ মন্দির ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে। ভোরের ভক্তপুর বিশেষভাবে প্রাণবন্ত—বাজার, মন্দির ও স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন তখন শহরটিকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
সা: পারুর মূল বার্তাও জীবনেরই অংশ: মৃত্যু সবার জন্য অনিবার্য, আর শোকও মানুষের অভিন্ন অভিজ্ঞতা। তাই এখানে মৃত্যুকে উদযাপন করা হয় না; বরং বিশ্বাস করা হয়, প্রিয়জনের আত্মা পরিত্রাণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে—আর তাকে ভালোবাসা ও আনন্দের সঙ্গে বিদায় জানানোই এই উৎসবের উদ্দেশ্য।