চারদিকে হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। জলে শাপলা-শালুক, ভেসে বেড়ানো হাঁস আর দূরে মাছ ধরার নৌকা। এই প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝেই মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ‘ভুরভুরি জোড়া পুল’ এখন স্থানীয় ও দূরদূরান্তের ভ্রমণপিপাসুদের বিকেল কাটানোর নতুন গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের মেদেনীমহল এলাকায় কাউয়াদীঘি হাওরের মধ্যে জায়গাটির অবস্থান। রাজনগর উপজেলা সদর থেকে উত্তরের এ সড়ক গ্রাম ও হাওর পেরিয়ে কুশিয়ারা নদীর তীরে বালাগঞ্জ খেয়াঘাট পর্যন্ত গেছে।

ভুরভুরি জোড়া পুল থেকে যেদিকে চোখ যায়, বর্ষায় সেদিকেই দেখা মেলে হাওরের জলরাশি। কোথাও শাপলা-শালুক ও কচুরিপানা, কোথাও সবুজ ঘাস। জলে হাঁস ভেসে বেড়ায়, আকাশে ওড়ে চিল। স্থানীয় জেলেদের নৌকায় মাছ ধরার দৃশ্যও যোগ করে আলাদা আকর্ষণ।

মেদেনীমহলে ভুরভুরি ছড়ার ওপর আগে থেকেই একটি উঁচু পুল ছিল। হাওরে নৌকা চলাচলের সুবিধার জন্য এটি উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্ষায় গ্রামের মানুষ পুলের নিচ দিয়ে নৌকায় যাতায়াত করেন। বৈশাখে হাওর থেকে বোরো ধানও আনা হয় এ পথে।

পুরোনো পুলটি কিছুটা জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় সম্প্রতি পাশে নতুন আরেকটি পুল নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি পুল থাকায় স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি ‘ভুরভুরি জোড়া পুল’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

নতুন পুল নির্মাণ ও রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়ক সংস্কারের পর গত কয়েক মাসে এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। বিকেলে আশপাশের গ্রামের পাশাপাশি দূরের এলাকা থেকেও অনেকে আসছেন। ছুটির দিনে ভিড় আরও বেশি হয়।

মেদেনীমহল গ্রামের গেন্দু মিয়া বলেন, ‘বৈশাখ মাসে এই স্থানটিতে অনেক মানুষ থাকে। তখন ধান কাটা হয়। এখানে ধান মাড়াই-ঝাড়াই হয়। বর্ষায় অনেকে মাছ মারেন। দুই মাস ধরে অনেক মানুষ আসছেন। আশপাশের মানুষ আসেন, দূরের মানুষও আসেন। ছুটির দিন খুব বেশি থাকেন। মেঘ-বৃষ্টি এলে কিছু কমে যায়। সন্ধ্যার পর পর্যন্ত লোকজন থাকেন।’

দর্শনার্থীদের আগমন বাড়ায় স্থানীয় তরুণ, প্রবাসীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জায়গাটির সৌন্দর্য ও পর্যটন সুবিধা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছেন। পুলের রেলিং ও আশপাশের গাছের গোড়া রং করা হয়েছে। বসার জন্য তৈরি করা হয়েছে বেঞ্চ। লাগানো হয়েছে কৃষ্ণচূড়ার চারা।

স্থানীয় শায়েক তালুকদার ও মো. রাজন জানান, বৃষ্টির সময় দর্শনার্থীদের আশ্রয়ের জন্য পরিবেশ ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে একটি ছাউনি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। হালকা খাবারের দোকান, ফুলের গাছ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ডাস্টবিন স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

তবে নতুন পুলটি পুরোনোটির তুলনায় নিচু হওয়ায় এর নিচ দিয়ে নৌকা চলাচল করতে পারে না বলে স্থানীয়দের আক্ষেপ রয়েছে। হাওরাঞ্চলের যোগাযোগ ও নৌচলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যৎ পর্যটন উন্নয়নে পরিকল্পিত অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

বর্ষার বিকেলে খোলা হাওরের বাতাস, জলরাশি ও গ্রামীণ জীবনের দৃশ্য দেখতে ভুরভুরি জোড়া পুলে এখন নিয়মিত মানুষের সমাগম হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পর্যটন সুবিধা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা গেলে কাউয়াদীঘি হাওরঘেরা এই স্থান রাজনগরের পরিচিত স্থানীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও বিকশিত হতে পারে।