হিমবাহের পানিতে সৃষ্ট ঝরনা, ফিরোজা রঙের হ্রদ আর তুষারঢাকা পর্বতের অসাধারণ দৃশ্যের জন্য কানাডার বার্গ লেক ট্রেইল উত্তর আমেরিকার অন্যতম আকর্ষণীয় পদযাত্রার পথ। ভয়াবহ বন্যার ক্ষত কাটিয়ে পুরোপুরি খুলে যাওয়া এই বিখ্যাত ট্রেইলে এবার পর্যটকদের অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে রবসন পাস হাট।

কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার মাউন্ট রবসন প্রভিন্সিয়াল পার্কে অবস্থিত বার্গ লেক ট্রেইল। জ্যাসপার ন্যাশনাল পার্কের পশ্চিমে থাকা ৪২ থেকে ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ যাওয়া-আসার এই পথ কানাডার অন্যতম পরিচিত দুর্গম পদযাত্রার গন্তব্য।

মাউন্ট রবসন ভিজিটর সেন্টার থেকে শুরু হওয়া পথটি প্রাচীন বন পেরিয়ে উঠে গেছে আল্পাইন উপত্যকায়। পথে হিমবাহের পানিতে সৃষ্ট অসংখ্য ঝরনা, হোয়াইট ফলস, এম্পেরর ফলস এবং ফিরোজা রঙের বার্গ লেক দেখা যায়। পুরো দৃশ্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে আছে কানাডিয়ান রকিজের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট রবসন।

৩ হাজার ৯৫৪ মিটার উঁচু মাউন্ট রবসনের হিমবাহ অঞ্চল প্রায় ৮০০ মিটার নিচে বার্গ লেকের দিকে নেমে এসেছে। ক্যালগারির পদযাত্রী আমান্ডা এলিয়া এই পথের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন, ‘এটি সত্যিই শ্বাসরুদ্ধকর। অবশ্যই দেখার মতো একটি পদযাত্রার পথ।’

২০২১ সালের জুনে পশ্চিম কানাডায় তীব্র তাপপ্রবাহের পর দ্রুত বরফ গলা ও ভারী বৃষ্টিতে ভয়াবহ বন্যা হয়। এতে বার্গ লেক ট্রেইল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পদযাত্রীদের হেলিকপ্টারে সরিয়ে নিতে হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত তিন ধাপে পথটি আবার চালু করা হয়।

পুনর্নির্মাণের সময় ভবিষ্যৎ বন্যার ঝুঁকি বিবেচনায় পথের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নদী পারাপারের সংখ্যা কমানো এবং প্লাবনভূমিতে অবস্থানের সময় সীমিত করার মাধ্যমে ট্রেইলটিকে আরও টেকসই করার চেষ্টা করেছে বিসি পার্কস, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারেরা।

২০২৬ সালের মে মাসে ট্রেইলের উত্তর প্রান্তের কাছে চালু হয়েছে দুইতলা রবসন পাস হাট। কয়েক দশকের পরিকল্পনার পর নির্মিত এই পাহাড়ি আশ্রয়কেন্দ্রে ১২ জন অতিথি থাকতে পারেন। এর ফলে পর্যটকদের রাত কাটানোর জন্য প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ ভারী তাঁবু ও শিবিরের সরঞ্জাম বহন করতে হবে না।

আশ্রয়কেন্দ্রটির নিচতলায় ঘুমানোর ব্যবস্থা এবং ওপরতলায় উন্মুক্ত সাধারণ কক্ষ ও বড় বারান্দা রয়েছে। সেখান থেকে এম্পেরর ফেস, রবসন গ্লেসিয়ার, মাউন্ট রেসপ্লেনডেন্ট ও মাউন্ট রবসনের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। উদ্বোধনের আগেই এর সংরক্ষণ সুবিধা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ হয়ে যায়।

সাধারণত বার্গ লেক ট্রেইল সম্পন্ন করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। পথে ছয়টি দুর্গম শিবির রয়েছে। প্রথম আট কিলোমিটার পথ কিনি লেক পর্যন্ত সাইকেল, শিশুদের ঠেলাগাড়ি ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্যও প্রবেশযোগ্য।

আরও সময় হাতে থাকলে পর্যটকেরা স্নোবার্ড পাস, রিফ গ্লেসিয়ার, টোবোগান ফলস ও হারগ্রিভস লেক লুপ ঘুরে দেখতে পারেন। বিশেষ করে ওপর থেকে বার্গ লেকের বিস্তৃত দৃশ্য এই অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ।

তবে অভিজ্ঞ পদযাত্রী ম্যাট সমবার্টের মতে, হিমবাহ দ্রুত সরে যাওয়ায় বর্তমান দৃশ্য দীর্ঘমেয়াদে একই থাকবে না। তাঁর ভাষায়, ‘এটি গভীর অনুভূতি তৈরি করে, যদিও তা ক্ষণস্থায়ী। হিমবাহ সরে যাওয়ায় এই দৃশ্য আরও ১০০ বছর থাকবে বলে আশা করা যায় না।’

নতুন আশ্রয়কেন্দ্র, জলবায়ু সহনশীল পুনর্নির্মিত পথ এবং কানাডিয়ান রকিজের অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য মিলিয়ে বার্গ লেক ট্রেইল আবারও আন্তর্জাতিক প্রকৃতিপ্রেমী ও পদযাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে।