পটুয়াখালী প্রতিনিধি
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে এক জেলের জালে ধরা পড়েছে বিরল প্রজাতির একটি প্যারটফিশ (টিয়া মাছ)। সচরাচর এ প্রজাতির মাছ এ অঞ্চলে ধরা না পড়ায় মাছটি দেখতে মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের একটি আড়তে ভিড় করেন উৎসুক জনতা।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে চরমোন্তজের জেলে বাবুল মাতুব্বর মাঝির এফবি ভাই ভাই ট্রলারে ধরা পড়া মাছটি মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ফয়সাল ফিস আড়তে নিয়ে আসা হয়। মাছটির ওজন প্রায় ৭০০ গ্রাম। পরে নিলামে এটি ৩ হাজার টাকায় কিনে নেন ওই আড়তের মালিক।
জানাগেছে, বাবুল মাতুব্বর মাঝির নেতৃত্বে ১৭ জন জেলে নিয়ে ট্রলারটি দুই দিন আগে বঙ্গোপসাগরের পায়রা বন্দরের শেষ বয়া সংলগ্ন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। জাল উত্তোলনের সময় ইলিশ ও পোয়াসহ অন্যান্য মাছের সঙ্গে বিরল এ প্যারটফিশটিও ধরা পড়ে।
জেলে বাবুল মাতুব্বর বলেন, রাতের দিকে জাল ফেলেছিলাম। পরে ইলিশ ও অন্যান্য মাছের সঙ্গে এ মাছটিও উঠে আসে। এর আগে আমাদের জালে কখনো এমন মাছ ধরা পড়েনি। এ মাছটি আমি প্রথমবার দেখলাম।
ফয়সাল ফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মাছটি বিক্রির জন্য চট্টগ্রামে পাঠানো হবে। ইতোমধ্যে বরফ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
ব্লু অ্যাকশন ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত ডব্লিউসিএস (WCS) ও ওয়ার্ল্ডফিশের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান বলেন, ‘মাছটি Blue-barred Parrotfish ev Scarus ghobban নয় বরং স্থানীয়দের বর্ণনা ও নমুনা অনুযায়ী এটি Scarus yufar (ধোফার প্যারটফিশ) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এটি স্কারিডি (ঝপধৎরফধব) পরিবারের একটি সামুদ্রিক মাছ।
সাধারণত প্রবালপ্রাচীর ও পাথুরে সামুদ্রিক এলাকায় বসবাস করলেও খাদ্যের সন্ধান, প্রজনন কিংবা সমুদ্রস্রোতের কারণে গভীর সমুদ্রে চলে আসে। ফলে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে পরিচালিত ট্রলারের জালেও মাঝে মধ্যে এ ধরনের মাছ ধরা পড়তে পারে।
তিনি আরও জানান, প্যারটফিশ প্রবালপ্রাচীরের ওপর জন্মানো শৈবাল খেয়ে প্রবালের সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে প্রবাল ক্ষয় করে সূক্ষ্ম বালু তৈরিতেও এ মাছের অবদান রয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, এ ধরনের মাছ বাংলাদেশের জলসীমায় খুবই বিরল। এটি Scarus yufar, যা ‘ধোফার প্যারটফিশ’ নামেও পরিচিত। আমাদের উপকূলে এ প্রজাতির মাছ সচরাচর দেখা যায় না।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ এন্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘প্যারটফিশ বা তোতা মাছ — সম্ভবত Scarus ghobban, বাংলায় যাকে বলা হয় নীল টিয়া মাছ। এটি প্রবালপ্রাচীরের মাছ, বাংলাদেশে যার নিয়মিত দেখা মেলে সেন্ট মার্টিনে। আমাদের জেলেরা সাধারণত একে লক্ষ্য করে ধরেন না। এটি ওঠে আকস্মিক ধরা (bycatch) হিসেবে- সেট গিলনেট, ট্রামেল নেট, বড়শি বা বটম ট্রলে, বিশেষত কক্সবাজার-সেন্ট মার্টিন উপকূলে। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্ব কম বলে অনেক সময় এসব মাছ 'মিশ্র মাছ' হিসেবে গোনা হয় বা ফেলে দেওয়া হয়, ফলে সরকারি অবতরণ পরিসংখ্যানে এদের প্রকৃত উপস্থিতি ধরা পড়ে না। পরিবেশগত দিক থেকে প্যারটফিশ প্রবালপ্রাচীরের 'মালী' - প্রবালের গায়ে জমা শৈবাল খেয়ে সাফ করে এবং মৃত প্রবাল কুরে বালি তৈরি করে, যা নতুন প্রবাল জন্মানোর জায়গা করে দেয়। এদের সংখ্যা কমলে শৈবাল প্রবালকে ঢেকে ফেলে।’