অনলাইনে উড়োজাহাজের টিকেট বুকিং ও ভ্রমণসেবা নিতে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করা কয়েকশ গ্রাহক ও সাব-এজেন্টের প্রায় ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ‘ফ্লাইট এক্সপার্টের’ বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সাতজনের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, সিআইডি।
ঢাকার মতিঝিল থানায় শনিবার মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি করা হয়। সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিআইডি এ তথ্য জানিয়েছে।
সিআইডির অভিযোগ, কয়েকশ গ্রাহক ও সাব-এজেন্টের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নিয়েও নির্ধারিত উড়োজাহাজের টিকেট সরবরাহ করেনি ফ্লাইট এক্সপার্ট। এভাবে প্রতিষ্ঠানটি ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৩১ হাজার ৯০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলার আসামিরা হলেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান বিন রশিদ শাহ সায়েম, সভাপতি এম এ রশিদ শাহ সম্রাট, পরিচালক আমির হামজা রশিদ শাহ নায়েম, এ কে এম শাহদাত হোসেন, আব্দুল গণি মেহেদী, অর্থ বিভাগের প্রধান মো. সাকীব হোসেন এবং সোমা ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসেসের স্বত্বাধিকারী মোতাহের হোসেন।
২০১৬ সালে অনলাইনভিত্তিক উড়োজাহাজের টিকেট বিক্রির মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে ফ্লাইট এক্সপার্ট। পরে হোটেল বুকিং এবং হজ ও ওমরাহ প্যাকেজসহ বিভিন্ন ভ্রমণসেবা চালু করে প্রতিষ্ঠানটি।
সিআইডি বলছে, ২০১৯ সালে ‘এফইবিডি’ নামে যৌথমূলধনী কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন নেওয়া হলেও ফ্লাইট এক্সপার্ট ও এফইবিডি উভয় নামেই ব্যবসা ও ব্যাংকিং লেনদেন পরিচালিত হতো।
প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা থেকে ব্যবসা এবং সরাসরি গ্রাহক, উভয় পদ্ধতিতে উড়োজাহাজের টিকেট বিক্রি করত। বিভিন্ন সময়ে অস্বাভাবিক মূল্যছাড়ের ঘোষণা দিয়ে সাব-এজেন্ট ও সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অগ্রিম অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ সিআইডির।
সংস্থাটির ভাষ্য, টিকেট সরবরাহ না করেই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান বিন রশিদ শাহ সায়েম ২০২৫ সালের ১ আগস্ট দেশ ছাড়েন। পরদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ ফ্লাইট এক্সপার্টের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে অগ্রিম টাকা দেওয়া টিকেট বিক্রেতা এজেন্সি ও হাজারো গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়েন।
সিআইডির অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ফ্লাইট এক্সপার্ট বিভিন্ন আইএটিএ অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে টিকেট সংগ্রহ করলেও বহু ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে পুরো অর্থ নিয়েও টিকেট দেয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই টিকেটের বিপরীতে একাধিক উৎস থেকে অর্থ নেওয়ার ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে।
সিআইডির দাবি, এফইবিডির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়া অর্থ পরে ফ্লাইট এক্সপার্টের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, উত্তোলন ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের উৎস, মালিকানা ও প্রকৃতি গোপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেশ ছাড়ার পরও কয়েকজন পরিচালক ও অর্থ বিভাগের প্রধান বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ উত্তোলন ও স্থানান্তর করেছেন বলে জানিয়েছে সিআইডি।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতারণার মাধ্যমে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৩১ হাজার ৯০ টাকা আত্মসাৎ এবং পরে ব্যাংকিং লেনদেনের মাধ্যমে ওই অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের প্রমাণ পাওয়ার দাবি করে অর্থপাচারের মামলাটি করেছে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট।
অনলাইনে টিকেট বুকিংয়ের ক্ষেত্রে যাত্রীদের প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই, বুকিং রেফারেন্স সংরক্ষণ এবং সরাসরি উড়োজাহাজ সংস্থার মাধ্যমে টিকেটের বৈধতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অস্বাভাবিক মূল্যছাড়ে অগ্রিম অর্থ পরিশোধের আগে বুকিং ও অর্থ ফেরতের শর্ত যাচাই করলে আর্থিক ঝুঁকি কমানো সম্ভব।