ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে মাওলিনং গ্রামের অবস্থান। মাত্র ৬০০ মানুষের এই গ্রামে প্রতি শনিবারই ভিড় করেন প্রায় এক হাজার পর্যটক। ফুলে সাজানো সরু পথ, ঝকঝকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তা আর ‘এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম’ খেতাবের সত্যতা নিজের চোখে দেখতেই তারা এখানে আসেন।
কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে গ্রামটিতে এক নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। সপ্তাহে একদিন, সেটা রোববার, গ্রামের একমাত্র প্রবেশপথের কালো লোহার গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রহরীরা দাঁড়িয়ে থেকে দিনের ভ্রমণকারীদের ফিরিয়ে দেন। অর্থাৎ, ওই দিন পর্যটকদের জন্য গ্রামটি পুরোপুরি বন্ধ।
পর্যটনের মাধ্যমে যাদের ভাগ্য বদলে গেছে, সেই গ্রাম কেন স্বেচ্ছায় একদিনের জন্য পর্যটকদের নিষিদ্ধ করল?
গ্রামবাসীদের ভাষায়, তারা সপ্তাহে অন্তত একদিন গ্রামের ‘প্রকৃত’ জীবনের স্বাদ পেতে চান।

পরিচ্ছন্নতার অনন্য সংস্কৃতি
বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে, ভারতের মেঘালয় রাজ্যে অবস্থিত মাওলিনং। 
২০০৩ সালে ডিসকভার ইন্ডিয়া ম্যাগাজিন গ্রামটিকে ‘এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম’ ঘোষণা করার পর থেকেই এটি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

ভারতের অনেক অঞ্চলে যেখানে পরিচ্ছন্নতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে মাওলিনং ছোটবেলা থেকেই শিশুদের পরিচ্ছন্ন থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়। অনেক শিশু প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নেমে শুকনো পাতা পরিষ্কার করে এবং ময়লার ঝুড়ি খালি করে। গ্রামবাসীরা বর্জ্য আলাদাভাবে ধ্বংস করেন এবং গ্রামের সৌন্দর্য রক্ষায় গর্ববোধ করেন।
২০১৪ সালে ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’ শুরু করার কিছুদিন পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রেডিওতে দেওয়া ভাষণে এই গ্রামের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেছিলেন, “পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এখানকার মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এতে আমাদের বিশ্বাস জন্মায় যে দেশের মানুষ চাইলে ভারতও একদিন পরিচ্ছন্ন হবে।”

পর্যটনে বদলে যায় গ্রামের ভাগ্য
এই স্বীকৃতির পর মাওলিনং সারা ভারতে পরিচিত হয়ে ওঠে। অনেক গ্রামবাসী কৃষিকাজ ছেড়ে পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত হন। গড়ে ওঠে গেস্টহাউস, রেস্তোরাঁ, স্মারকপণ্যের দোকান এবং চায়ের স্টল। প্রতিদিন পর্যটকবাহী ভ্যানের সারি এসে ভিড় জমাতে থাকে গ্রামে।
কিন্তু দুই দশক পর গ্রাম কমিটির মনে হয়, পর্যটন ও গ্রামীণ জীবনের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা জরুরি। তাই তারা রোববার দিনের ভ্রমণকারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

রোববার শুধু প্রার্থনার জন্য
মাওলিনংয়ের অধিকাংশ বাসিন্দা খ্রিষ্টান। তাদের মতে, রোববার চার্চে প্রার্থনা ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর দিন। পর্যটকদের সেবা দিতে গিয়ে তারা সেই সময়টুকু হারিয়ে ফেলছিলেন।

গ্রাম কমিটির সদস্য প্রেশাস খংডুপ বলেন, এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য হলো গ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং শৃঙ্খলা রক্ষা করা।
স্থানীয় বাসিন্দা ফেস্টিভ্যাল খারিম্বা, যিনি পর্যটকদের কাছ থেকে ৩০ রুপি নিয়ে গ্রামের বিখ্যাত বাঁশের স্কাইওয়াকে ওঠার সুযোগ দেন, বলেন, “এটি আমাদের জন্য ভালো। এখন আমরা চার্চে যেতে পারি, প্রার্থনা করতে পারি। রোববার পর্যটক থাকলে আমাদের জন্য সমস্যা হয়।”
তবে শনিবার যারা গেস্টহাউসে ওঠেন এবং রোববারও সেখানে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয় বলে বিবিসির খবরে বলা হয়েছে।