মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে পুরো অঞ্চলের পর্যটন খাতে। আকাশপথে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা সতর্কতা এবং বিমানভাড়া বৃদ্ধির কারণে বহু পর্যটক এখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে এশিয়ার অন্যান্য গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নাগরিকদের সতর্কতা জারি করেছে। ড্রোন হামলা, আকাশসীমা ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ইরান, ইসরায়েল, ইয়েমেন ও সিরিয়াসহ কয়েকটি দেশে ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পুরো অঞ্চলের পর্যটন ও বাণিজ্যিক ভ্রমণ খাতে।

বিমানভাড়া বৃদ্ধি ও ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল

মধ্যপ্রাচ্য সফরের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন অনেক ভ্রমণকারী। ভিয়েতনামভিত্তিক জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান এলারটন অ্যান্ড কো.-এর রিজিওনাল অ্যাসোসিয়েট ম্যানেজার মিশেল বুই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে জানান, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা এবং মরুভূমি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।

তবে ফ্লাইট খোঁজার সময়ই তিনি উচ্চ বিমানভাড়ার মুখোমুখি হন। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আকাশপথে অনিশ্চয়তার কারণে মার্চ মাসে ভিয়েতনাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রাবিরতিসহ বিমান টিকিটের মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছে যায়। ফলে পরিকল্পনাটি আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যয় আরও বাড়তে পারে, যা পর্যটকদের ভ্রমণ সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

বাড়ছে ভ্রমণ বাতিলের প্রবণতা

সেফ হারবারস ট্রাভেল গ্রুপের প্রেসিডেন্ট জে এলেনবি জানান, অনেক ভ্রমণকারী ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যগামী সফর বাতিল বা পরিবর্তন করেছেন। বিশেষ করে ফেরত-অযোগ্য টিকিট পরিবর্তনের অতিরিক্ত খরচ অনেকের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার মতে, প্রতিষ্ঠানটির এশীয় গ্রাহকদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ভ্রমণ বাতিলের হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক যাত্রী আন্তর্জাতিক রুটে প্রায় ৪৫০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত পরিবর্তন ফি দিতে অনাগ্রহী।

এলেনবি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে এখন অনেক ভ্রমণকারী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গন্তব্যগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও বিভিন্ন আন্তঃএশীয় রুটের চাহিদা বাড়ছে।

ব্যবসায়িক ভ্রমণে নতুন গন্তব্য

পর্যটনের পাশাপাশি ব্যবসায়িক ভ্রমণেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সিঙ্গাপুর ক্রুজ সেন্টারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যাকুলিন ট্যান জানান, সিঙ্গাপুর থেকে ইন্দোনেশিয়ার বাতাম দ্বীপে ফেরি যাত্রার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক প্রতিষ্ঠান এখন করপোরেট সভা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং কর্মীদের রিট্রিট আয়োজনের জন্য বাতামকে বেছে নিচ্ছে। কিছু সিঙ্গাপুরভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সেখানে নিয়মিত কার্যক্রমও পরিচালনা করছে।

৬ সিঙ্গাপুর ডলার জ্বালানি সারচার্জ বহাল থাকলেও সিঙ্গাপুর থেকে বাতামের প্রায় ৬০ মিনিটের ফেরি রুটে যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে স্বল্প খরচে স্বল্প সময়ের ভ্রমণের জন্য এ রুট জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

আঞ্চলিক ভ্রমণের দিকে ঝোঁক

পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সময়ে মানুষ সাধারণত কাছাকাছি, নিরাপদ ও তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল গন্তব্য বেছে নেয়। বর্তমান পরিস্থিতিতেও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না।

মাস্টারকার্ডের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এশীয় পর্যটকদের জন্য নিজ অঞ্চলের দেশগুলো এখন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যগামী বিমানভাড়া অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় তারা বিকল্প হিসেবে আঞ্চলিক ভ্রমণকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তিনি আরও জানান, এই প্রবণতা কত দিন স্থায়ী হবে তা মূলত বৈশ্বিক তেলের বাজার এবং জেট ফুয়েলের দামের ওপর নির্ভর করবে।

কোন দেশগুলো পাচ্ছে বাড়তি সুবিধা

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে।

কম ভ্রমণ ব্যয়, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, বৈচিত্র্যময় পর্যটন আকর্ষণ এবং তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশের কারণে এসব দেশে পর্যটকের আগ্রহ বাড়ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে এশিয়ার অভ্যন্তরীণ পর্যটন বাজার নতুন করে গতি পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।